প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ নির্বাহী কর্মকর্তা বা সিইও যদি হঠাৎ দায়িত্ব ছেড়ে দেন, তবে সেই মুহূর্তে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও স্থায়িত্বের মধ্যকার ব্যবধান ঠিক করে দেয় পরিচালন পর্ষদের বহু আগের নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত—’আমাদের পরবর্তী নেতা কে?’ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এমবিএ শিক্ষার্থী মো. তাসিকুজ্জামান তাঁর এক গবেষণাপত্রে করপোরেট দুনিয়ার এই চরম সত্যকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান এখনো তাদের নতুন নেতা বেছে নেওয়ার বিষয়টিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে না দেখে শেষ মুহূর্তের জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে মোকাবেলা করার ভুলটি করে থাকে।
গবেষণাপত্রটিতে ‘রিপ্লেসমেন্ট প্ল্যানিং’ এবং প্রকৃত ‘সাকসেশন প্ল্যানিং’-এর মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য টানা হয়েছে। রিপ্লেসমেন্ট প্ল্যানিং হলো স্রেফ আকস্মিক পদত্যাগের জন্য তৈরি করা যোগাযোগের একটি জরুরি তালিকা। এর বিপরীতে প্রকৃত সাকসেশন প্ল্যানিং হলো প্রতিভাবান কর্মীদের বহু বছর আগেই চিহ্নিত করে মেন্টরিং, কাজ অদলবদল এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তোলা।
প্রতিষ্ঠানে তৈরি উত্তরসূরি না থাকলে দশকের পর দশক ধরে অর্জিত অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা একরাতেই ধূলিসাৎ হতে পারে। বিনিয়োগকারীরা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্ব পরিমাপের অন্যতম শর্ত হিসেবে দেখেন সেই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের গভীরতা ও ধারাবাহিকতাকে। বাইরে থেকে উচ্চপদে কাউকে হায়ার করতে প্রতিষ্ঠানের খরচ হয় প্রথম বছরের বেতনের প্রায় ২০ থেকে ৩৩ শতাংশের বেশি প্রিমিয়াম। চড়া মূল্যে বাইরে থেকে আনা এসব এক্সটার্নাল হায়ারদের প্রথম দুই বছরে ব্যর্থ হওয়ার হারও আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।
গবেষণায় জেনারেল ইলেকট্রিক (জিই) ২০০১ সালে বহু প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্য থেকে জেফরি ইমেল্টকে নির্বাচন করা এবং ২০১৪ সালে মাইক্রোসফট অত্যন্ত সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় সত্যা নাদেলাকে সিইও পদে স্থলাভিষিক্ত করার উদাহরণ এনে বলা হয়—পদ্ধতিগত নেতৃত্ব হস্তান্তর কোম্পানির অগ্রগতি ধরে রাখে। বিপরীতে তুলে ধরা হয়েছে ভারতের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের কথা। ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রতিষ্ঠাতা ধীরুভাই আম্বানির মৃত্যুর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধ বছরের পর বছর ধরে সাম্রাজ্যকে বিভক্ত করে ফেলেছিল, যা বিনিয়োগকারী থেকে শুরু করে কর্মীদের পর্যন্ত অস্থিতিশীল করে তোলে।
পারিবারিক ব্যবসার ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও প্রকট। ওনারশিপ (মালিকানা) এবং ম্যানেজমেন্ট (ব্যবস্থাপনা) আলাদা না থাকায় নেতৃত্বের পরিবর্তন পারিবারিক কোন্দলে রূপ নেয়। এর ফলে যোগ্য পেশাদাররা ওপরের পদে যাওয়ার সুযোগ পান না। এই ঝুঁকি এড়াতে গবেষণায় একটি প্রথাগত ‘ফ্যামিলি গভর্ন্যান্স চার্টার’ এবং স্বাধীন উপদেষ্টা পর্ষদ গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও এইচআর অ্যানালিটিক্স কর্মীদের দক্ষতা ও ঝুঁকি পর্যালোচনায় সাহায্য করছে। তবে এআই প্রযুক্তি যেন অতীত বৈষম্যের পুনরাবৃত্তি না ঘটায়, সেজন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মানুষের বিচারবুদ্ধিকেই প্রাধান্য দিতে বলা হয়েছে। রিমোট কাজের যুগে সরাসরি কর্মীদের পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হওয়ায় পর্ষদের বার্ষিক এজেন্ডায় উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়াকে নিয়মিত চর্চা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মতামত লেখকের নিজস্ব
মোঃ তাসিকুজ্জামান
এম বি এ শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।



