দশকের পর দশক ধরে আধুনিক কারখানা, উন্নত প্রযুক্তি এবং বিপুল আর্থিক পুঁজিকে ব্যবসায়ের সাফল্যের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কিন্তু আজকের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের টেক্কা দিতে সবচেয়ে দুর্ভেদ্য যে সম্পদটি উঠে এসেছে, তা কোনো যন্ত্র নয়—মানুষ। কর্মীদের অর্জিত অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে এমন এক অনবদ্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়, যা শুধু অর্থ দিয়ে কেনা অসম্ভব। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এমবিএ শিক্ষার্থী তাঞ্জিলা রশীদ পুষ্পার এক বিশ্লেষণে আধুনিক করপোরেট দুনিয়ার এই নতুন বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছে।
কাজের পরিবেশ ও কৌশল নিয়ে গত কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, যেসব প্রতিষ্ঠান সঠিক কর্মী নিয়োগ, নিরবচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতাভিত্তিক পুরষ্কার এবং তথ্যের উন্মুক্ত আদান-প্রদানে বিনিয়োগ করে, তাদের উৎপাদনশীলতা থাকে অনেক উঁচুতে। একই সঙ্গে কমে কর্মীদের চাকরি ছাড়ার প্রবণতা। সুবিধাটি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় তখন, যখন কর্মীরা কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাঠামোর সাথে মানানসই বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করেন। প্রতিযোগীদের পক্ষে এই অভ্যন্তরীণ অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান হুট করে ছিনিয়ে নেওয়া কিংবা হুবহু অনুকরণ করা প্রায় অসম্ভব। সময়ের আবর্তে এই বিশেষায়িত দক্ষতা প্রতিষ্ঠানের ডিএনএ-তে রূপ নেয়, যা যেকোনো সংকটকালে সংস্থাকে খাপ খাইয়ে নিতে শক্তি জোগায়।
বাস্তব জগতের বিভিন্ন শিল্পখাতের দিকে তাকালে এই কৌশলগত সুবিধার নানামুখী রূপ চোখে পড়ে। যেমন, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগলের কথা ধরা যাক। গুগল তাদের নিয়োগ ও কর্মী ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত অনুমানের বদলে অভ্যন্তরীণ ডেটা এবং নানা গবেষণাকে প্রাধান্য দেয়। সেই সাথে ম্যানেজারদের বিকাশ ও কাজের ফাঁকে শেখার সুযোগে তারা বিপুল বিনিয়োগ করে।
অন্যদিকে আমেরিকার সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স ফ্লাইট চলাচলে তাদের নির্ভরযোগ্যতার যে অনন্য খ্যাতি গড়ে তুলেছে, তার মূল ভিত্তি কেবল সস্তা বিমান ভাড়া নয়। তাদের রয়েছে বহুমুখী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মী দল, যারা নিজেদের নির্ধারিত ভূমিকার বাইরে গিয়েও সহকর্মীদের সহযোগিতায় হাত বাড়ান। রাতারাতি এমন করপোরেট সংস্কৃতি অনুকরণ করা কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।
আবার বিশ্বখ্যাত গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টয়োটার উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। সেখানে অ্যাসেম্বলি লাইনের সাধারণ কর্মীকেও ত্রুটি দেখা মাত্রই উৎপাদন বন্ধ করার পূর্ণ এখতিয়ার ও বিশ্বাস দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সাধারণ কর্মীদেরই একটি স্বয়ংক্রিয় মান-নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় রূপান্তর করেছে তারা।
তবে যন্ত্রের বদলে শুধু মানুষের ওপর বাজি ধরা কিন্তু ঝুঁকিমুক্ত নয়। অভিজ্ঞ কর্মীরা যেকোনো সময় প্রতিষ্ঠান ছেড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থায় যোগ দিয়ে মূল্যবান প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান সাথে নিয়ে যেতে পারেন। কলকারখানার কোনো যন্ত্রের মতো কর্মীর অর্জিত মেধা ও দক্ষতাকে ব্যালেন্স শিটে অবচয় (Depreciation) হিসাব করে মেটানো যায় না। তদুপরি, কর্মীর পেছনে প্রশিক্ষণের যে অর্থ ঢালা হয়, তার সুনির্দিষ্ট রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) পরিমাপ করা বেশ জটিল। আর যেসব প্রতিষ্ঠান সার্বিক প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির বদলে গুটিকয়েক ‘স্টার পারফর্মার’-এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, সেসব কর্মীর প্রস্থানে পুরো সংস্থাই এক মুহূর্তে চরম সংকটে পড়ে।
বিশ্বমানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্য বার্তাটি একদম পরিষ্কার: মেধাবী কর্মী খুঁজে বের করে নিয়োগ দেওয়াটা সবচেয়ে সহজ কাজ। আসল কঠিন কাজ হলো এমন এক টেকসই কর্মসংস্কৃতি ও অভ্যন্তরীণ জ্ঞান ব্যবস্থাপনা তৈরি করা, যা সেই মেধাবী মানুষকে এবং তাদের ঝুলিতে থাকা মূল্যবান জ্ঞানকে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ধরে রাখবে। আধুনিক করপোরেট যুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদৃঢ় সাফল্যের রহস্য লুকিয়ে রয়েছে ঠিক এই জায়গাটিতেই।
মতামত লেখকের নিজস্ব
তানজিলা রশিদ পুষ্প
এম বি এ শিক্ষার্থী, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।



