― Advertisement ―

ভারতের সঙ্গে চুক্তির প্রতিবাদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে ছাত্র জোটের বিক্ষোভ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে রেল কানেকটিভিটি বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তির প্রতিবাদে পুলিশের বাধা অতিক্রম করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে...

ঢাকার বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি স্বপ্ন পূরণ এখনো অনেক দূর

দশকের পর দশক ধরে ঢাকার রাজপথ যেন এক যানজটের চিরায়ত শহর হয়ে দাঁড়িয়েছে। শত শত মালিকের অধীনে থাকা হাজার হাজার বাস লিপ্ত হয় যাত্রী ধরার এক উন্মত্ত প্রতিযোগিতায়। লেন পরিবর্তন, মোড়ে মোড়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং ‘চুক্তিভিত্তিক’ গাড়ি চালানোর এই বিশৃঙ্খল সংস্কৃতিতে নিরাপত্তার চেয়ে গতিই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

এই পরিস্থিতি উত্তরণে একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে ‘বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেম’ বা রুট ভিত্তিক বাস কোম্পানির ধারণা সামনে আসে। বিশেষজ্ঞ, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজন এই বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু জনমনে ব্যাপক প্রত্যাশা জাগানো এই ব্যবস্থাটির সুফল সম্পর্কে সবাই একমত হলেও, এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো অধরা। সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রকল্পের মেয়াদ এক বছরেরও বেশি সময় আগে শেষ হয়ে যাওয়ায় এই উদ্যোগের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

বাস রুট র‍্যাশনালাইজেশন (বিআরআর)

বিআরআর হলো এমন একটি ব্যবস্থা যার লক্ষ্য বিশৃঙ্খলা সরিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেল চালু করা—যেখানে থাকবে সুশৃঙ্খল কোম্পানি, নির্ধারিত বাস স্টপেজ এবং ই-টিকিটিং ব্যবস্থা। কিন্তু ২০২৬ সালেও ঢাকার গণপরিবহনের এই উদ্যোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকা পড়ে আছে, আর এটি চালুর জন্য গৃহীত প্রকল্পটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

একটি সমন্বিত বাস ফ্র্যাঞ্চাইজির ধারণা নতুন নয়। এটি ছিল ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের স্বপ্ন। তিনি শহরের ২৫০০-এর বেশি ব্যক্তি মালিকানাধীন বাসকে রঙ অনুযায়ী নির্দিষ্ট রুটে ৬ থেকে ৭টি বড় কোম্পানির অধীনে আনার পরিকল্পনা করেছিলেন।

তার প্রয়াণের পর উদ্যোগটি ‘ঢাকা নগর পরিবহন’ নামে পুনর্জীবিত হয় এবং বেশ আড়ম্বরের সাথে যাত্রা শুরু করে। ঘাটারচর থেকে কাঁচপুরসহ নির্দিষ্ট কিছু রুটে পরীক্ষামূলক (পাইলটিং) কার্যক্রমও চলে। তবে সেই চেষ্টাগুলো খুব একটা ‘সন্তোষজনক ফলাফল’ আনতে পারেনি।

ফ্র্যাঞ্চাইজির বাইরের বেসরকারি বাসগুলো যাত্রী কেড়ে নিতে থাকায় শৃঙ্খলা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এছাড়া ডেডিকেটেড বাস বে-র মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও কখনো দৃশ্যমান হয়নি। কর্তৃপক্ষ যখন এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিল, তখনই প্রকল্পের মেয়াদের সময়সীমা শেষ হওয়ায় রূপান্তরের এই মূল উদ্যোগটি গত এক বছরের বেশি সময় ধরে স্থবির হয়ে আছে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)-এর ডেপুটি ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানার এবং এই উদ্যোগের প্রকল্প পরিচালক ধ্রুব আলম দ্য বাংলাদেশ মেইল (টিবিএম)-কে নিশ্চিত করেছেন যে, বাস ফ্র্যাঞ্চাইজি সিস্টেমের প্রকল্পটি ১২ মাসেরও বেশি সময় আগে শেষ হয়েছে।

ধ্রুব আলম স্বীকার করেন, “প্রকল্পটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। আমরা মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেছি, কিন্তু সরকার এখনো তা মঞ্জুর করেনি। প্রশাসনিক অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত রুট র‍্যাশনালাইজেশনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ কার্যত স্থবির।”

ফলে প্রকল্পের অনুপস্থিতিতে পাইলট ফেজে অর্জিত সামান্য সাফল্যগুলোও এখন ধূলিসাৎ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

বৈদ্যুতিক বাস: কর ছাড় ও পরিবেশবান্ধব স্বপ্ন

এই স্থবিরতার মধ্যেই বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি (বিআরটিওএ) একটি বৈদ্যুতিক বাস দিয়ে রুট চালুর নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল আলম বিশ্বাস করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবস্থায় উত্তরণ অনিবার্য। আর বৈদ্যুতিক বাস আনতে প্রণোদনা প্রয়োজন।

তিনি টিবিএম-কে বলেন, “শৃঙ্খলা ফেরাতে ফ্র্যাঞ্চাইজি ভিত্তিক ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। দক্ষ চালক এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনায় কোম্পানি কাঠামোর অধীনে সেবা পরিচালনা করা জরুরি।”

তবে মালিকদের একটি শর্ত রয়েছে। তারা পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস বা উচ্চমানের রিকন্ডিশন্ড বাস আমদানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স মওকুফ এবং প্রণোদনা চান।

সাইফুল আলম যোগ করেন, “আমরা যদি বৈদ্যুতিক বাস চালু করি, তবে সেবার মান বাড়বে এবং দূষণ কমবে। এজন্য সরকারের উচিত বাস আমদানি নীতি শিথিল করা।”

ডিটিসিএ-র ধ্রুব আলম জানান, তারা বৈদ্যুতিক বাসের বিষয়ে আশাবাদী হলেও বিষয়টি বর্তমানে আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনার টেবিলে আটকে আছে।

টার্মিনালের আতঙ্ক: চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব

বিশৃঙ্খলা শুধু রাস্তায় নয়, শুরু হয় টার্মিনাল থেকেই।

সাইফুল আলম উল্লেখ করেন যে, ঢাকার টার্মিনালগুলো বর্তমানে ধারণক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি বাস সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এই বাড়তি বাসের চাপে আবাসিক এলাকায় অবৈধ পার্কিং তৈরি হচ্ছে, যা আশেপাশের এলাকাগুলোকে অঘোষিত ডিপোতে পরিণত করছে।

টার্মিনালের ‘মাফিয়া’ চক্র নিয়ে তিনি সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তার মতে, অবৈধ দোকানপাট, টোকেন বাণিজ্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দখলদারিত্বই এই বিশৃঙ্খলার মূল কারণ।

সাইফুল আলমের অভিযোগ, “এই কর্মকাণ্ডের পেছনে চাঁদাবাজি, টিকিটের কালোবাজারি এবং যাত্রী হয়রানি চরম পর্যায়ে। বাড়তি ভাড়া আদায়ের জন্য ভুয়া কাউন্টারও খোলা হচ্ছে।”

তিনি একটি ৩০ থেকে ৫০ বছরের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার আহ্বান জানান, যেখানে সীমিত জায়গায় বেশি বাস রাখার জন্য বহুতল আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেন। এছাড়া তিনি একটি ‘রোটেশন সিস্টেম’ প্রস্তাব করেন, যেখানে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাস টার্মিনালে থাকবে এবং বাকিগুলো ব্যক্তিগত ডিপোতে অবস্থান করবে, যা শুধুমাত্র তাদের নির্ধারিত সময়ে টার্মিনালে আসবে।

ঢাকার পরিবহনের মূল ট্র্যাজেডি হলো সমন্বয়ের অভাব। মালিকরা তাদের সংগঠনের ভেতরে অনিয়মের কথা স্বীকার করলেও তারা যুক্তি দেন যে, তারা একা এই ব্যবস্থা ঠিক করতে পারবেন না।

সাইফুল আলম জোর দিয়ে বলেন, “মালিকদের পক্ষে একা শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং আইন প্রয়োগের জন্য পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”