দেশে হামের প্রাদুর্ভাব এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে আরও সাতটি শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃতদের মধ্যে দুই শিশুর ক্ষেত্রে হামের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, আর বাকি পাঁচজন মারা গেছে হামের তীব্র উপসর্গ নিয়ে। সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে এই উদ্বেগজনক তথ্য জানানো হয়, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর এক বিশাল চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ২৪ ঘণ্টায় যে দুই শিশুর মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে, তারা উভয়ই ঢাকা বিভাগের। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজন ঢাকা বিভাগের এবং একজন রাজশাহী বিভাগের বাসিন্দা। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বর্তমানে ঢাকা বিভাগ হামের সংক্রমণের উপকেন্দ্র বা এপিসেন্টারে পরিণত হয়েছে। গত একদিনে সর্বোচ্চ ৭৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে এই বিভাগেই।
হাসপাতালগুলোতে তাকালে দেখা যায় এক করুণ চিত্র। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৭২৯ জন শিশু। অধিদপ্তরের প্রতিবেদন বলছে, ১২ এপ্রিল সকাল ৮টা থেকে ১৩ এপ্রিল সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে মোট ৮২ জনের শরীরে হামের জীবাণু শনাক্ত হয়েছে। এই স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এত বিপুল সংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বিশেষজ্ঞ মহলে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সামগ্রিক চিত্রে দেখা যায়, শেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ৩৭১ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৬১৫ জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। আক্রান্তের হারের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাসপাতালে ভর্তির হারও। গত একদিনে ভর্তি হওয়া ৭২৯ জনের মধ্যে ২৭৪ জনই ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। তুলনামূলকভাবে রংপুর ও ময়মনসিংহে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও পরিস্থিতি শিথিল করার সুযোগ নেই।
তবে এই অন্ধকার পরিস্থিতির মাঝে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে সুস্থতার হার। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া ৭১৩ জন শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সর্বোচ্চ ৩০৫ জন শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী হাসপাতাল ছেড়েছে। চিকিৎসকরা দিনরাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন এই পরিস্থিতি সামাল দিতে।
দীর্ঘমেয়াদী পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে মোট ৩০ শিশুর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাটি আরও ভয়াবহ—১৫৬ জন। এক মাসেরও কম সময়ে এত শিশুর প্রাণহানি দেশের টিকাদান কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য সচেতনতাকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৭ হাজার ২৪ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়েছে।
হাম শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যাও গত কয়েক সপ্তাহে কয়েক গুণ বেড়েছে। এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৭২১ জনের শরীরে পজিটিভ রিপোর্ট পাওয়া গেছে। হাসপাতালে ভর্তির মোট সংখ্যা ১০ হাজার ৯৫৪ জন, যার একটি বড় অংশই ঢাকা বিভাগের শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশই নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতাভুক্ত ছিল না অথবা তাদের পুষ্টির অভাব ছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ। সঠিক সময়ে টিকা না দিলে এবং আক্রান্ত শিশুকে আইসোলেশনে না রাখলে এটি দ্রুত মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে এর সংক্রমণ রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে সারা দেশে বিশেষ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালুর পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে ঝরে পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং প্রতিটি পরিবারের জন্য এক একটি দীর্ঘশ্বাস। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং জনসচেতনতার অভাব হামের এই বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা এবং শিশুদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করাই এখন এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ। অন্যথায় এই মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



