― Advertisement ―

দক্ষিণ চীন সাগরে নতুন সংকট: চীনের বিরুদ্ধে সাগরের পানিতে বিষ ঢালার অভিযোগ ফিলিপাইনের

দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ জলসীমায় চীন ও ফিলিপাইনের মধ্যকার উত্তেজনা এবার এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করেছে। ফিলিপাইন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেছে যে, বিতর্কিত এলাকায় নিয়োজিত চীনা জেলেরা সায়ানাইড ঢেলে সাগরের পানিকে বিষাক্ত করছে। সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) ফিলিপাইনের পক্ষ থেকে এই দাবি করা হয়, যা কেবল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ম্যানিলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূলত স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন এলাকায় এই বিষপ্রয়োগের ঘটনা ঘটছে। এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিং ও ম্যানিলার মধ্যে সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পরিচিত। ফিলিপাইন দাবি করেছে যে, চীনা জেলেরা মাছ ধরার সহজ উপায় হিসেবে সায়ানাইড ব্যবহার করছে, যা সাগরের প্রবাল প্রাচীর এবং সামগ্রিক বাস্তুসংস্থানকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

ফিলিপাইনের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল (NSC) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, গত বছর থেকেই স্প্রাটলি দ্বীপপুঞ্জের ‘সেকেন্ড থমাস শোল’ এলাকায় এই বিষপ্রয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটি এমন একটি কৌশল, যার মাধ্যমে চীনা জেলেরা কেবল মাছ শিকারই করছে না, বরং সাগরের ওই নির্দিষ্ট এলাকা থেকে ফিলিপিনো জেলেদের বিতাড়িত করারও চেষ্টা করছে। এর ফলে সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্য চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সেকেন্ড থমাস শোল এলাকাটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি প্রধান আন্তর্জাতিক নৌপথের কাছাকাছি অবস্থিত এবং ধারণা করা হয় যে, এই অঞ্চলের সমুদ্রতলে বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ ও প্রাকৃতিক গ্যাস সঞ্চিত রয়েছে। চীন দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যার ফলে আগে থেকেই সেখানে চীনা জাহাজের সঙ্গে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ডের একাধিক ছোট-বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় পুরো অংশের ওপর চীনের দাবি ২০১৬ সালে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল অবৈধ ঘোষণা করেছে। তবে চীন সেই রায় প্রত্যাখ্যান করে সাগরের বিভিন্ন অংশে কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ এবং সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে। ফিলিপাইনের অভিযোগ সত্য হলে, এটি হবে চীনের পক্ষ থেকে সামুদ্রিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তির এক চরম লঙ্ঘন।

সামুদ্রিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, সায়ানাইডের মতো তীব্র বিষ সাগরের পানিতে মেশালে তা কেবল বর্তমান মাছের ভাণ্ডার ধ্বংস করে না, বরং প্রবাল প্রাচীরকে মৃত সাদা পাথরে পরিণত করে। প্রবাল প্রাচীর হলো সাগরের প্রাণকেন্দ্র; এগুলো ধ্বংস হওয়া মানে ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে মাছের উৎপাদন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া। এতে করে ফিলিপাইনসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর লক্ষ লক্ষ মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।

ফিলিপাইন আরও দাবি করেছে যে, চীনা নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ডের প্রত্যক্ষ মদদে এই বিষপ্রয়োগের কাজ চলছে। বেইজিং এর মাধ্যমে ওই অঞ্চলে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ফিলিপাইন সরকার ইতিমধ্যে এই ঘটনার ড্রোন ফুটেজ এবং পরিবেশগত নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে, যা আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে।

এদিকে, চীনের পক্ষ থেকে এই অভিযোগ নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে অতীতে বেইজিং সবসময়ই তাদের জেলেদের কার্যক্রমকে বৈধ দাবি করে এসেছে এবং ফিলিপাইনের বিরুদ্ধে অযথা উসকানি দেওয়ার পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। কিন্তু বিষপ্রয়োগের মতো একটি পরিবেশগত অপরাধের অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে তলানিতে নিয়ে যেতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো ফিলিপাইনের এই অভিযোগের ওপর গভীর নজর রাখছে। দক্ষিণ চীন সাগরে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা এবং পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তারা ফিলিপাইনকে সমর্থন দিয়ে আসছে। যদি আন্তর্জাতিক তদন্তে এই বিষপ্রয়োগের প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে চীনের ওপর নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার দাবি উঠতে পারে।

পরিশেষে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগরের এই সংঘাত কেবল মানচিত্রের সীমানা নির্ধারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন প্রকৃতির ওপর যুদ্ধের রূপ নিয়েছে। ফিলিপাইনের এই অভিযোগ যদি প্রমাণিত হয়, তবে এটি হবে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম বড় একটি পরিবেশগত ট্র্যাজেডি। বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ সামুদ্রিক অঞ্চলটি রক্ষায় এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।