― Advertisement ―

ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার আলোচনা ব্যর্থ; ইরানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বহুল প্রতীক্ষিত শান্তি আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার ম্যারাথন বৈঠক শেষে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছু “উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি” হলেও একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তেহরানের অনমনীয় অবস্থান। ভ্যান্সের মতে, আলোচনার টেবিল থেকে এখন বড় সিদ্ধান্তের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ইরানের ওপর বর্তেছে।

গত সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে আয়োজিত এই বৈঠকে দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকরা মুখোমুখি হয়েছিলেন। বৈঠকের মূল লক্ষ্য ছিল চলমান সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং একটি দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তৈরি করা। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স এক বিবৃতিতে বলেন, “আমরা একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে আলোচনায় বসেছিলাম। ইরান আমাদের কিছু অবস্থানের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেতও দিয়েছে। তবে একটি চূড়ান্ত চুক্তির জন্য যে রাজনৈতিক সাহসিকতা প্রয়োজন, তা এখন তেহরানকেই দেখাতে হবে।”

২১ ঘণ্টার দীর্ঘ এই আলোচনাকে বিশ্লেষকরা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম জটিল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন। টানা দুই দিন ধরে চলা এই বৈঠকে সামরিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়। মার্কিন প্রতিনিধি দল দাবি করেছে যে, তারা একটি নমনীয় অবস্থানে থেকে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু মৌলিক অধিকার থেকে সরে আসতে অস্বীকৃতি জানায়।

ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনার প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল ইরানের পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ ইস্যুটি। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে দাবি করেছিল যে, আন্তর্জাতিক তদারকি এবং সীমিত সমৃদ্ধকরণের শর্ত মেনেই চুক্তি হতে হবে। কিন্তু তেহরান তাদের পারমাণবিক সক্ষমতাকে জাতীয় সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দাবি করে তা ত্যাগে অস্বীকার করে। এই মৌলিক বিরোধের কারণেই ২১ ঘণ্টার অক্লান্ত পরিশ্রম শেষ পর্যন্ত কোনো দলিলে রূপ নিতে পারেনি।

ইসলামাবাদের এই আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার খবর আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এই আলোচনা থেকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল না আসে, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ছায়াযুদ্ধ এবং সামরিক মহড়া আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের “সিদ্ধান্ত এখন ইরানের কোর্টে” বক্তব্যটি তেহরানের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

তবে নিরাশ হওয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি বলে মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। ভ্যান্সের ভাষায়, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের দিকে কিছুটা এগিয়েছে। এর অর্থ হলো, অতীতে যে সব বিষয়ে আলোচনার কোনো সুযোগই ছিল না, এখন সেসব বিষয়ে দুই দেশ অন্তত কথা বলছে। এই সামান্য অগ্রগতিই ভবিষ্যতে বড় কোনো চুক্তির ভিত্তি হতে পারে। তবে এর জন্য তেহরানকে তাদের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষায় কিছুটা লাগাম টানতে হবে বলে মনে করে ওয়াশিংটন।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আয়োজিত এই বৈঠকটি ইসলামাবাদের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বিশ্বের দুটি চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ পাকিস্তানের মাটিতে বসে ২১ ঘণ্টা আলোচনা করাটি ইঙ্গিত দেয় যে, এই অঞ্চলে পাকিস্তানের প্রভাব এখনো অটুট। পাকিস্তান সরকার এই আলোচনাকে ফলপ্রসূ করার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে, কিন্তু পারমাণবিক ইস্যুর মতো জটিল বিষয় সমাধান করা কেবল তাদের হাতে ছিল না।

ভবিষ্যতে এই আলোচনার গতিপথ কী হবে, তা এখন সম্পূর্ণ নির্ভর করছে ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের ওপর। যদি ইরান পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণের বিষয়ে কিছুটা ছাড় দেয়, তবে পেন্টাগন এবং হোয়াইট হাউস অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টিতে দ্রুত এগোবে। জে. ডি. ভ্যান্সের কড়া বার্তার পর তেহরান এখন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিই এখন বিশ্ব রাজনীতির মূল আকর্ষণ।

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামাবাদের এই দীর্ঘ ম্যারাথন আলোচনা কেবল একটি বৈঠক ছিল না, বরং এটি ছিল একটি বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কায় থাকা অঞ্চলের জন্য শান্তির এক চিলতে আশা। যদিও কোনো চুক্তি হয়নি, তবুও আলোচনার দরজা এখনো খোলা রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ইরান কি তাদের অবস্থানে অনড় থাকবে নাকি বিশ্ব শান্তির স্বার্থে কিছুটা নমনীয় হবে।