পয়লা বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী ‘হালখাতা’র অনুপ্রেরণায় জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক বকেয়া পরিশোধের জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরের নেভি গলিতে এনসিপি আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রতি এই আহ্বান জানান। তাঁর মতে, নতুন বছরের শুরুতে সরকার কার্যক্রম শুরু করলেও ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজগুলো এখনো বকেয়া রয়ে গেছে।
নাহিদ ইসলাম বলেন, প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা যেভাবে পুরনো সব পাওনা চুকিয়ে নতুন হালখাতা খোলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও সরকারের উচিত জনগণের কাছে থাকা ‘রক্তের দেনা’ বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত পূরণ করা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “সংস্কারের বকেয়া রেখেই সরকার নতুন বছরের হালখাতা খুলেছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সরকার এখনো আশানুরূপ পদক্ষেপ নেয়নি।”
জাতীয় জীবনের এই বকেয়াকে ‘জুলাই সনদ’ হিসেবে অভিহিত করে নাহিদ ইসলাম স্মরণ করিয়ে দেন যে, তরুণ প্রজন্ম একটি নতুন বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছে। এ সময় তিনি পরম শ্রদ্ধায় শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদিকে স্মরণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সরকার গঠিত হলেও জনগণ যে কাঠামোগত সংস্কার আশা করেছিল, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে জনগণের কাছে সরকারের এই ‘রক্তের ঋণ’ দিন দিন বাড়ছে।
বক্তব্যের এক পর্যায়ে এনসিপি প্রধান গণভোটের গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “যারা জুলাই সনদকে অমান্য করার চেষ্টা করছে কিংবা গণভোটের রায়কে শ্রদ্ধা জানাচ্ছে না, তাদের সতর্ক করে দিতে চাই। অচিরেই গণভোটের গণরায় অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে।” তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় না।
বর্তমান সরকারের আইনি পদক্ষেপ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ। তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকার জনগণের আস্থার সঙ্গে এক প্রকার বেইমানি করেছে। তিনি দাবি জানান, দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাতিলকৃত সেই অধ্যাদেশগুলোকে বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপন করে সেগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপান্তর করতে হবে।
সাংস্কৃতিক মুক্তি ও সংস্কারের লড়াই নিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত বছরগুলোতে অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করা হয়েছিল এবং সেগুলোকে ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি পয়লা বৈশাখের মতো অসাম্প্রদায়িক উৎসবগুলোকেও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বলয়ে আটকে ফেলা হয়েছিল। তিনি ঘোষণা দেন, এনসিপি এই উৎসবগুলোকে এখন সাধারণ মানুষের ‘নাগরিক উৎসবে’ পরিণত করার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির লড়াই সমান্তরালভাবে চলবে উল্লেখ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের শুদ্ধিকরণ ছাড়া একটি জাতির প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, সাংস্কৃতিক দলীয়করণের অবসান না ঘটলে ফ্যাসিবাদী মানসিকতা সমাজ থেকে নির্মূল করা যাবে না। তাই নতুন বছরের শুরু থেকেই এনসিপি সংস্কারের দাবিতে মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় থাকবে।
বাংলামোটরের নেভি গলিতে আয়োজিত এই নববর্ষের অনুষ্ঠানে নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। বর্ণিল পোশাকে শোভাযাত্রা ও ঢাকের বাদ্যের মাধ্যমে এনসিপি তাদের সাংগঠনিক শক্তির প্রদর্শন করে। নাহিদ ইসলামের এই কড়া বার্তা মূলত আগামী দিনে সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এবং জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলামসহ অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এই সম্মিলিত উপস্থিতিও এটিই ইঙ্গিত দেয় যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কারিগররা বর্তমান সরকারের সংস্কার গতি নিয়ে সন্তুষ্ট নন।
পরিশেষে নাহিদ ইসলাম নতুন বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমুক্ত রাষ্ট্রে পরিণত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সরকার নতুন বছরে জনগণের বকেয়া সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সত্যিকারের হালখাতা খুলবে। জনগণের চাওয়া পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের এই দাবি ও রাজপথের সাংস্কৃতিক লড়াই চলমান থাকবে।



