― Advertisement ―

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধাবহে কাঁপছে ভারতের অর্থনীতি: ২৫ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে

পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাত ও ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার আঁচ এবার দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ অর্থনীতি ভারতেও অনুভূত হচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ‘ইউএনডিপি’ (UNDP) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই সংঘাতের প্রভাবে ভারতে নতুন করে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। ‘মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা: এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মানব উন্নয়নের প্রভাব’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে সংঘাতের সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষয়ক্ষতির একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পশ্চিম এশিয়ায় অস্থিতিশীলতার ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় ভারতের মতো আমদানি-নির্ভর দেশগুলোর উৎপাদন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের পকেটে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যা অনেককে নতুন করে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ইউএনডিপি বলছে, ভারতে আগে যেখানে প্রায় ৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ছিল, বর্তমান উত্তেজনার ফলে সেই সংখ্যাটি লাফিয়ে ২৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং ভারতের গত কয়েক দশকের মানব উন্নয়ন অগ্রগতির জন্য একটি বড় ধাক্কা। সংঘাতের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি সাধারণ মানুষের জীবিকাও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

পশ্চিম এশিয়ার এই সংকট ভারতের সরকারি বাজেটের ওপরও প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে। জ্বালানি আমদানিতে বাড়তি খরচ এবং ভর্তুকি বজায় রাখতে গিয়ে উন্নয়নমূলক খাতগুলোতে বরাদ্দ কমাতে হতে পারে সরকারকে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হবে। মানব উন্নয়ন সূচকে ভারতের অবস্থান সুসংহত করার যে লক্ষ্য ছিল, তা এই সংঘাতের কারণে পিছিয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদনটিতে কেবল ভারত নয়, বরং পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর যুদ্ধের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে সর্বোচ্চ ২৯৯ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হতে পারে। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগের মন্দাভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক কঠিন সময় নিয়ে আসছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিম এশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় আসে। সেখানে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়বে। এর ফলে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। পরিবহন রুটে অস্থিরতার কারণে ভারতের রপ্তানি বাণিজ্যও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে, যা সামগ্রিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে শ্লথ করে দিতে পারে।

জাতিসংঘের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই সংঘাতের ফলে বিশ্বব্যাপী নতুন করে প্রায় ৮৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক বিশ্বে একটি অঞ্চলের যুদ্ধ কেবল ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো জ্বালানি সমৃদ্ধ অঞ্চলের অস্থিরতা পুরো বিশ্বের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।

প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো (SME) এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে বেকারত্বের হার বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। কর্মহীন এই মানুষগুলোই মূলত দারিদ্র্যের নতুন মিছিলে যোগ দেবে।

উপসংহারে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনে বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে এর চরম মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে ভারতের মতো দেশগুলো, যারা দারিদ্র্য বিমোচনে গত এক দশকে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে, তাদের সেই অর্জনগুলো ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

পরিশেষে, এই প্রতিবেদনটি একটি সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, মানব উন্নয়নের অগ্রযাত্রা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে যখন ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ মানুষের জীবনের চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিম এশিয়ার শান্তি কেবল ওই অঞ্চলের জন্য নয়, বরং ভারতের ২৫ লাখ মানুষের জীবনমান রক্ষার জন্যও এখন অপরিহার্য।