বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা আর ব্যাপক কূটনৈতিক প্রস্তুতির পরেও আলোর মুখ দেখল না ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা। দীর্ঘ ২১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা বা চুক্তি ছাড়াই পাকিস্তান ত্যাগ করেছেন মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জে. ডি. ভ্যান্স। রবিবার (১২ এপ্রিল ২০২৬) সংবাদ সম্মেলনে তিনি নিজেই এই বিফলতার কথা নিশ্চিত করেন, যা মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগের মেঘ সৃষ্টি করেছে।
উপরাষ্ট্রপতি ভ্যান্সের মতে, আলোচনার টেবিল থেকে কোনো ইতিবাচক ফলাফল না আসার প্রধান অন্তরায় ছিল ইরানের অনড় অবস্থান। বিশেষ করে তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ বা সীমিত করতে রাজি না হওয়ায় আলোচনা ভেস্তে যায়। যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছিল যে, কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে হলে ইরানকে অবশ্যই তাদের পরমাণু প্রকল্পের লাগাম টেনে ধরতে হবে। কিন্তু ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় আলোচনাটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
এই কূটনৈতিক ব্যর্থতার ফলে গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সরাসরি বৈঠকের মাধ্যমে যে আস্থার পরিবেশ তৈরির চেষ্টা পাকিস্তান করেছিল, তা এখন সুদূর পরা পরাহত। সমর বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার টেবিলে সমাধানের পথ রুদ্ধ হওয়ায় সীমান্তে পুনরায় কামানের গোলা আর রকেটের গর্জন শোনা যাওয়া এখন কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও এই আলোচনার প্রভাব ছিল ব্যাপক। হরমুজ প্রণালী, যা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত, তা পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার আশা ছিল। কিন্তু বৈঠক ব্যর্থ হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি অনিশ্চিত সময়ের জন্য অবরুদ্ধ থাকতে পারে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় দেশের অর্থনীতির জন্যই অশনিসংকেত।
সফর শেষে ইসলামাবাদ ত্যাগের আগে জে. ডি. ভ্যান্স পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসা করে তাঁদের “অসাধারণ আতিথেয়তা”র জন্য ধন্যবাদ জানান। পাকিস্তান যেভাবে এই জটিল সংলাপে মধ্যস্থতা করেছে, তাকে মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি একটি মহৎ প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন, যদিও ফলাফল প্রত্যাশিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক ইস্যুটি দুই দেশের মধ্যে এমন এক দেওয়ালে পরিণত হয়েছে যা টপকানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ইরান দাবি করে আসছে যে, তাদের কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের দাবি এটি বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এই মৌলিক মতপার্থক্যের কারণেই ২১ ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনাও শেষ পর্যন্ত কেবল শব্দ বিনিময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট এই ব্যর্থতার ফলে আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার পথে। সিরিয়া, ইয়েমেন এবং লেবাননের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোতে এই আলোচনার সফলতার দিকে তাকিয়ে ছিল শান্তিকামী মানুষ। কিন্তু এখন সেই আশা অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। নতুন করে সামরিক মেরুকরণ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন।
পাকিস্তানের জন্য এই আলোচনাটি ছিল একটি বড় ধরনের কূটনৈতিক পরীক্ষা। ইসলামাবাদ চেষ্টা করেছিল নিজেদের এক বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রমাণ করতে। যদিও চুক্তি হয়নি, তবে দুই চিরশত্রুকে এক টেবিলে ২১ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা পাকিস্তানের জন্য একটি বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন অনেক আঞ্চলিক বিশ্লেষক। তারা মনে করছেন, ভবিষ্যতে আলোচনার যে কোনো পথ খোলা রাখার ভিত্তিটি এখানেই স্থাপিত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, জে. ডি. ভ্যান্সের পাকিস্তান ত্যাগ কেবল একটি সফরের সমাপ্তি নয়, বরং একটি বড় কূটনৈতিক সুযোগের অপমৃত্যু হিসেবেও দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহলে এখন আলোচনার বদলে পুনরায় নিষেধাজ্ঞার খড়গ বা সামরিক সংঘাতের আশঙ্কাই প্রবল হচ্ছে। তবে শান্তিপ্রিয় বিশ্ব এখনো আশা করছে যে, হয়তো কোনো অলৌকিক উপায়ে পুনরায় আলোচনার দুয়ার খুলবে এবং পৃথিবী বড় কোনো ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা পাবে।



