যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্রমবর্ধমান দাবিতে এবার সরাসরি শামিল হয়েছেন দেশটির কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর (CIA) সাবেক পরিচালক জন ব্রেনান। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক কিছু কর্মকাণ্ড ও মন্তব্যকে দেশের নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে ‘মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ এবং ‘অযোগ্য’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এই গোয়েন্দা প্রধান।
শনিবার (১১ এপ্রিল ২০২৬) টেলিভিশন চ্যানেল এমএস নাউ-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ব্রেনান এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্পকে পদচ্যুত করার জন্য মার্কিন সংবিধানের ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করার এখনই উপযুক্ত সময়। ব্রেনানের মতে, এই সংশোধনীটি মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তিত্বদের কথা মাথায় রেখেই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
সাক্ষাৎকারে ব্রেনান মূলত ট্রাম্পের ইরান বিষয়ক সাম্প্রতিক নীতি ও মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইরানি সভ্যতা ধ্বংস করার ব্যাপারে ট্রাম্প যে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, তা কেবল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের লঙ্ঘন নয়, বরং এটি লাখ লাখ মানুষের জীবনের ওপর ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করেছে। একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ তাঁকে কমান্ডারের দায়িত্ব পালনের অযোগ্য করে তোলে।
জন ব্রেনান, যিনি বারাক ওবামা প্রশাসনে সিআইএ প্রধানের দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তিনি ট্রাম্পের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ব্রেনান স্পষ্ট ভাষায় বলেন, ট্রাম্প স্পষ্টতই মানসিকভাবে অস্থিতিশীল। এমন একজন ব্যক্তির হাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল পরমাণু অস্ত্রভান্ডারসহ শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ থাকা বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্য একটি ‘অ্যালার্মিং’ পরিস্থিতি।
২৫তম সংশোধনী নিয়ে ব্রেনানের যুক্তিটি বেশ গভীর। মার্কিন সংবিধানের এই সংশোধনী মূলত প্রেসিডেন্টের শারীরিক বা মানসিক অযোগ্যতার ক্ষেত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে। ব্রেনান মনে করেন, ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে যে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করার মতো যৌক্তিক বা মানসিক অবস্থায় নেই। তাই সংবিধানকে সমুন্নত রাখতেই ক্যাবিনেট সদস্যদের এই সংশোধনী ব্যবহারের কথা ভাবা উচিত।
সাবেক এই গোয়েন্দা প্রধানের মতে, ট্রাম্প একজন ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ হিসেবে এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে তাঁকে আর একদিনও ক্ষমতায় রাখা উচিত নয়। ব্রেনানের এই বক্তব্য যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট এবং ট্রাম্প বিরোধী শিবিরে নতুন করে অক্সিজেন সরবরাহ করেছে। তবে রিপাবলিকান শিবির থেকে ব্রেনানের এই বক্তব্যকে ‘রাজনৈতিক বিদ্বেষ’ এবং ‘গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বাড়াবাড়ি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
ট্রাম্প ও ব্রেনানের মধ্যে শত্রুতা নতুন কিছু নয়। এর আগেও রাশিয়ার নির্বাচনে হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্রেনান ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন। বিপরীতে ট্রাম্প ব্রেনানকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ এবং ‘পলিটিক্যাল হ্যাক’ বলে আখ্যা দিয়ে তাঁর নিরাপত্তা ক্লিয়ারেন্স বাতিল করার হুমকি দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের পদচ্যুতির আহ্বান এবং ২৫তম সংশোধনীর উল্লেখ বিষয়টি ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে ব্রেনানের মতো একজন প্রভাবশালী সাবেক কর্মকর্তার এমন মন্তব্য ভোটারদের মনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যারা ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবে শঙ্কিত, তাদের কাছে ব্রেনানের যুক্তিটি অত্যন্ত শক্তিশালী বলে মনে হচ্ছে। তবে ক্যাবিনেটের সমর্থন ছাড়া ২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করা বাস্তবে প্রায় অসম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, ব্রেনানের এই সাক্ষাৎকার মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ফাটল ও আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে নিয়ে এলো। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি এই সমালোচনার জবাব সামরিক কোনো পদক্ষেপের মাধ্যমে দিতে চান, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ব্রেনানের এই মন্তব্যের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।



