আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বানচালের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সতর্ক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
গতকাল শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদির ওপর হামলাকে ‘খুবই প্রতীকী’ উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এর মাধ্যমে হামলাকারীরা নিজেদের শক্তির জানান দিতে চেয়েছে এবং স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে যে তারা নির্বাচনের প্রস্তুতিকে নস্যাৎ করতে উদ্যত।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন পর্যন্ত যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে বোঝা যায় ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেছে এবং প্রশিক্ষিত শুটার ব্যবহার করে মাঠে নেমেছে। এর মাধ্যমে তারা নির্বাচন আয়োজনের পুরো প্রক্রিয়াই ভেস্তে দিতে চাইছে।
বৈঠকে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতারা সরকারের কাছে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান। তারা বলেন, সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া ছাড়া নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
বৈঠকে দেশের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক দলই প্রধান উপদেষ্টাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তারা জুলাই বিপ্লবের চেতনা এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একযোগে দাঁড়াবে।
ঢাকা–৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান বিন হাদির ওপর প্রকাশ্য দিবালোকে গুলির ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তফসিল ঘোষণার পরপরই এমন ঘটনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বেড়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, তফসিল ঘোষণার পরপরই এমন ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশন এক ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে, এ আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এ অবস্থায় ভয় বা আতঙ্কে পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
গতাকাল শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত ‘দেশ গড়ার পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক কর্মশালায় লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
দলটির ধারাবাহিক কর্মশালার সপ্তম দিনে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, বিভিন্ন সূত্রের তথ্যে স্পষ্ট, এই সময়ে সবচেয়ে জরুরি হলো মানুষকে সাহস দেওয়া এবং নিজেদের মধ্যে ঐক্য আরও শক্ত করা।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এ নেতা বলেন, বিএনপি যত বেশি সংগঠিত ও সক্রিয় হবে, ততই যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে এবং তাতে ষড়যন্ত্রকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হবে।
বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, `হাদির ওপর হামলায় ঘটনার দায় সরকারেরও আছে। কারণ আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি, দেশের মধ্যে স্রোতের মতো অস্ত্র ঢুকছে। এখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ। পুলিশকে পুনর্গঠন করা হয়নি। এমন পরিস্থিতি থাকলে তো মানুষ ভোট দিতে যেতে ভয় পাবেন।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এএনএম মুনিরুজ্জামান বলেন, `আমাদের গণতন্ত্র উত্তরণের একমাত্র সিঁড়ি হচ্ছে এই নির্বাচন। নির্বাচন ছাড়া দেশে সম্পূর্ণ স্থিতিশীলতা কোনোভাবেই ফিরিয়ে আনা যাবে না। তাই আগামী নির্বাচন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং গ্রহণযোগ্য করতে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম বলেন, ‘বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নির্বাচন উপযোগী রাখা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শরিফ ওসমান হাদি হত্যাচেষ্টার ঘটনায় আসন্ন নির্বাচন আয়োজন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরাজিত শক্তি পালিয়ে গেলেও তাদের দোসররা প্রতিনিয়ত হুমকি ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে।’



