জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে পুরো ইউরোপজুড়ে বয়ে যাচ্ছে এক নজিরবিহীন ও রেকর্ড ভাঙা তীব্র তাপপ্রবাহ। এই চরম আবহাওয়ার কারণে এককভাবে ফ্রান্সে অতিরিক্ত অন্তত ১ হাজার মানুষের প্রাণহানি রেকর্ড করা হয়েছে। আজ রোববার (২৮ জুন, ২০২৬) ফ্রান্সের জাতীয় জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সংস্থা ‘স্যঁতে পাবলিক’ (Santé Publique France) এক জরুরি প্রক্ষেপণে এই ভয়াবহ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থাটি সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, তীব্র দাবদাহের কারণে সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ও আনুষঙ্গিক শারীরিক অসুস্থতায় আরও বহু মানুষ মারা গেছেন, যা এই প্রাথমিক হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে। ফলে ফ্রান্সে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা যে আরও অনেক বেশি, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়।
অতিরিক্ত মৃত্যুর প্রাথমিক ডেটা বিশ্লেষণ করে ‘স্যঁতে পাবলিক’ জানিয়েছে, তীব্র গরমে মৃতদের একটি বিশাল অংশই মূলত প্রবীণ ও শারীরিকভাবে দুর্বল নাগরিক। সংস্থাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছে, বিভিন্ন কেয়ার হোম (বৃদ্ধাশ্রম) এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসাবাড়ি থেকে মৃত্যুর পূর্ণাঙ্গ ও প্রত্যয়িত তথ্য এখনো সম্পূর্ণরূপে হাতে আসেনি; সেই পরিসংখ্যানগুলো যুক্ত হলে মৃত্যুর এই হার আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে পুরো ইউরোপ মহাদেশজুড়েই এক অবর্ণনীয় ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহ চলছে, যার কবলে পড়ে চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ। দাবদাহের কারণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশে কয়েক ডজন মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এই দুর্যোগ অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি মহাদেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং মূল অবকাঠামোগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানী ও পরিবেশ গবেষকেরা জানিয়েছেন, গত ২০ জুন থেকে শুরু হওয়া এই চলমান তাপপ্রবাহটি আধুনিক ইউরোপের ইতিহাসে রেকর্ড করা সবচেয়ে ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী জলবায়ু বিপর্যয়। তাঁরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে ইউরোপের সামগ্রিক জলবায়ু ও তাপমাত্রা অনেক দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, যা এই অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদে চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। তীব্র গরমে মহাদেশটির সার্বিক জনজীবন সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়েছে।
তবে সর্বশেষ আবহাওয়া পূর্বাভাস অনুযায়ী, ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলে চরম গরমের তীব্রতা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এবং তাপপ্রবাহটি বর্তমানে দেশটির পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিকের সীমান্ত অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ফ্রান্সের জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা (Météo-France) জানিয়েছে, দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলে চরম গরম কমলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা এখনো সর্বোচ্চ সতর্কবার্তার (রেড অ্যালার্ট) আওতায় রয়েছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ট (Stéphanie Rist) এক বিবৃতিতে বলেছেন, বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসার পরও মানবশরীরে এই তীব্র তাপপ্রবাহের ক্ষতিকর প্রভাব বা আফটার-ইফেক্ট প্রায় ১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ফরাসি গণমাধ্যম বিএফএম টিভিকে (BFM TV) দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্তেফানি রিস্ট অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “এই জলবায়ু দুর্যোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি, আমাদের চিকিৎসা সেবা খাতকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত থাকতে হবে।” স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্যঁতে পাবলিক যৌথভাবে জানিয়েছে, মৃত ব্যক্তিদের বেশিরভাগেরই বয়স ৬৫ বছর বা তার বেশি হলেও, তীব্র এই গরমের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি শিশু থেকে শুরু করে যুবক—সব বয়সী মানুষের ওপরই সমান প্রভাব ফেলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার বিভিন্ন শহরে জরুরি কুলিং সেন্টার স্থাপন ও স্বাস্থ্য সতর্কতা জারি রেখেছে।



