― Advertisement ―

ইউরোপ কাঁপছে তীব্র দাবদাহে; ফ্রান্সে গরম থেকে বাঁচতে গিয়ে পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু, ৫৪ অঞ্চলে ‘রেড অ্যালার্ট’

নজিরবিহীন ও প্রাণঘাতী তীব্র তাপপ্রবাহে (Heatwave) বিপর্যস্ত ফ্রান্সে গরমের তীব্রতা থেকে ক্ষণিকের স্বস্তি পেতে পানিতে নামার পর অন্তত ৪০ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। দেশটির সরকারি প্রশাসন জানিয়েছে, নিহতদের সিংহভাগই কোনো ধরনের লাইফগার্ড বা নিরাপত্তা তদারকিবিহীন অননুমোদিত উন্মুক্ত জলাশয় ও নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে গভীর পানিতে ডুবে মারা গেছেন। মঙ্গলবার (২৩ জুন, ২০২৬) প্যারিসে উদ্ভূত সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে মন্ত্রিসভার এক জরুরি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু (Sébastien Lecornu) মিডিয়াকে জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হওয়া এই দাবদাহে এখন পর্যন্ত ৪০টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, যাদের বড় অংশই তরুণ। এই ঘটনাকে তিনি একটি জাতীয় ও মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। একই সাথে দেশের ক্রীড়ামন্ত্রী মারিনা ফেরারি সতর্ক করে বলেছেন, তাপপ্রবাহের সুযোগে অনিরাপদ স্থানে গোসল করাকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এদিকে ফ্রান্সের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় কারপঁত্রা (Carpentras) শহরে একটি বদ্ধ গাড়ির ভেতর থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হওয়া দুই ও চার বছর বয়সী দুই শিশুর মৃত্যুর পেছনেও এই তীব্র তাপমাত্রাকে দায়ী করছেন স্থানীয় চিকিৎসা কর্মকর্তারা। অন্যদিকে, বোর্দো (Bordeaux) অঞ্চলে হিটস্ট্রোক ও তাপজনিত তীব্র কার্ডিয়াক জটিলতায় ভুগে ৮০ থেকে ৯৫ বছর বয়সী আরও তিন বৃদ্ধের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশটির জাতীয় আবহাওয়া সংস্থা ‘মেতেও-ফ্রান্স’ (Météo-France) জানিয়েছে, সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার ভোর পর্যন্ত ফ্রান্সে ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম রাত রেকর্ড করা হয়েছে। দেশজুড়ে প্রধান ৩০টি আবহাওয়া কেন্দ্রের গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা দাঁড়ায় ২১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা ২০১৯ সালের ২৫ জুলাইয়ের ২১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের পূর্ববর্তী অল-টাইম রেকর্ডকে ভেঙে দিয়েছে। বোর্দো ও পোয়তিয়েরসহ প্রধান শহরগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ গ্রিড ও জরুরি জনসেবা ব্যবস্থা এখন চরম লোড ও চাপের মুখে পড়েছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে ফ্রান্সের ৫৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘লাল সতর্কতা’ বা রেড অ্যালার্ট (Red Alert) জারি করা হয়েছে। ইউরোপের এই দেশটিতে ঐতিহ্যগতভাবে অধিকাংশ আবাসিক ভবনে কোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (AC) না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বহু অঞ্চলের স্কুল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের আগেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে কিংবা ক্লাসের সময়সূচি পরিবর্তন করা হয়েছে। শুধু ফ্রান্স নয়, এই চরম আবহাওয়ার ধাক্কা লেগেছে পুরো ইউরোপে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অধিদপ্তর (Met Office) চার দিনের বিশেষ সতর্কতা জারি করে জানিয়েছে, দেশটির কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে জুন মাসের দীর্ঘদিনের রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে। এমনকি সাধারণত শীতল আবহাওয়ার দেশ স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান (San Sebastián) শহরেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা জুনের স্বাভাবিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি।

জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ‘ওমেগা ব্লক’ (Omega Block) নামে পরিচিত একটি বিশেষ বায়ুমণ্ডলীয় ও ভৌগোলিক অচলাবস্থার কারণে আফ্রিকা মহাদেশের সাহারা মরুভূমি থেকে ধেয়ে আসা উত্তপ্ত ও শুষ্ক বাতাস দীর্ঘ সময় ধরে পুরো ইউরোপের ওপর আটকে রয়েছে। বাতাসের গতিবেগ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় এই তাপপ্রবাহ আরও বেশি প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের শীর্ষ গবেষক ক্লেয়ার বার্নস (Claire Barnes) আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবের কারণেই এ ধরনের চরম বৈরী আবহাওয়া ও ঝড়ের তীব্রতা দিন দিন ঘন ঘন ফিরে আসছে। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই পরিবেশবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে ইউরোপ মহাদেশে এমন প্রাণঘাতী দাবদাহ অত্যন্ত সাধারণ ও নিয়মিত একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হতে পারে বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘আল-জাজিরা’র (Al Jazeera) বিশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।