আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি আরবের বাদশাহ যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি এমবিএস নামে বহুল পরিচিত। সৌদির বাদশাহ হওয়া আর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এমন কিছু নাই যে তিনি করেননি। এমন কি নিজের পিতাকে সব সময় নজরে রাখা আর নিজের ভাইকেও আটক করতে সংকোচবোধ করেননি এই যুবরাজ।
এছাড়াও মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারীদের গাড়ী চালানোর স্বাধীনতা, ড্রেসকোড পরিবর্তন, বিচারকের টেবিলে বুলেট রাখা, একের পর আটক, বিলাসবহুল সামগ্রীর প্রতি আকষর্ণ ছিলো তার।
মোহাম্মদ বিন সালমান :
২০১৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং পরে প্রভাব খাটিয়ে ২০১৭ সালের ২১ জুন ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পিছনে সালমানের চাঞ্চল্যকর অজানা তথ্য উঠে এসেছে পশ্চিমা লেখক ডেভিড বি ওটাওয়ে ও বান হার্ভাডের লেখা বইয়ে। দুজনের বইয়ের এসব নিয়ে বিবিসি হিন্দিতে লিখেছেন রেহান ফজল।
বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর) লেখাটি বিবিসি বাংলার অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
কেন বাবাকে নজরে রাখেন মোহাম্মদ বিন সালমান?
সৌদির বাদশাহ আবদুল্লাহ ফুসফুস ক্যান্সারে মৃত্যুর পর নতুন বাদশাহ হন সালমান বিন আবদুল আজিজ। বাদশাহ হওয়ার পর নিজের ৬৮ বছরের পুত্র মুকরিন বিন আবদুল আজিজের নাম ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে ঘোষণা করেন৷ কিন্তু মাত্র তিন মাস পরই ছেলেকে বরখাস্ত করেন সালমান বিন আবদুল আজিজ।
ছেলে মুকরিন বিন আবদুল আজিজের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়সী ভাইপো মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ওই জায়গায় আনেন। আর মাত্র ২৯ বছরের পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেন সালমান বিন আবদুল আজিজ।
এরপরই মূলত শুরু হয় মোহাম্মদ বিন সালমানের বাদশাহ হওয়া আর ক্ষমতায় টিকে থাকার কৌশল৷
লেখক ডেভিড বি. ওটাওয়ে তার বইয়ে মোহাম্মদ বিন সালমান সম্পর্কে লিখেছেন, “প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরপরই বাদশাহর গেট কিপার (দ্বার রক্ষক) হওয়ার জন্য নিজের পদকে ব্যবহার করতে শুরু করেন মোহাম্মদ বিন সালমান।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, খুব দ্রুতই মোহাম্মদ বিন সালমান তার বাবাকে পরিবার এবং তার বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের থেকে আলাদা করে ফেলেন। এমনকি সালমান তার বাবা- মাকেও উভয়ের সঙ্গেও দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়।
ডেভিড বি ওটাওয়ের বইয়ে দাবি করা হয়েছে, “মোহাম্মদ বিন সালমান কার্যত তার মা এবং দুই বোনকে গৃহবন্দি করেন এবং বাবাকে এ সম্পর্কে কিছুই টের পেতে দেননি।
এখানেই শেষ নয়। বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ নিজের স্ত্রীর কথা জিজ্ঞেস করলেই বলা হতো চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছে তাকে।
রহস্যময় মোহাম্মদ বিন নায়েফকে আটক ও পদত্যাগে বাধ্য করা:
তৎকালীন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন নায়েফকে অপসারণ করে পুত্র মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স করার সিদ্ধান্ত নেন বাদশাহ সালমান। রমজানের শেষের দিকে ২০১৫ সালের ২০শে জুন রাতে রাজপরিবারের একাধিক সদস্য মক্কায় জড়ো হন।
সেই রাতে “মোহাম্মদ বিন নায়েফ ও তার দুই রক্ষী বাদশাহের সঙ্গে দেখা করার জন্য লিফটে উঠেছিলেন। দোতলায় লিফটের দরজা খুলতেই বাদশাহের সৈন্যরা এগিয়ে গিয়ে নায়েফের রক্ষীদের অস্ত্র ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।”
“পাশের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় নায়েফকে। তিনি চলে যেতে উদ্যত হলে, তাকে বাধা দেওয়া হয় এবং ক্রাউন প্রিন্স পদ থেকে পদত্যাগ করার জন্য চাপ দেওয়া হতে থাকে। কিন্তু তাদের কথা শুনতে নারাজ ছিলেন নায়েফ।
ওই রাতেই নায়েফকে গৃহবন্দি করা হয় এবং রয়্যাল কোর্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা রয়্যাল কাউন্সিলের সদস্যদের ডেকে জানতে চান, তারা মোহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ বানানোর সিদ্ধান্তের বিষয়ে একমত কী-না।
কাউন্সিলের ৩৪জন সদস্যের মধ্যে ৩১জন সদস্য সমর্থন জানান। তাদের ফোনকল রেকর্ড করা হয় এবং মোহাম্মদ বিন নায়েফকে জানানো হয় তার কতজন আত্মীয় বাদশাহ পদত্যাগ সিদ্ধান্তে সমর্থন করেছেন।
বিচারকের টেবিলে বুলেট রাখা:
সৌদি রাজপরিবারের ইতিহাস পর্যবেক্ষক রিচার্ড লেসি লিখেছেন, “মোহাম্মদ বিন সালমান তখনো ক্রাউন প্রিন্স হননি। রিয়াদে একটা মূল্যবান জমির উপর নজর পড়ে তার বাবার। কিন্তু জমির মালিক সেটা বিক্রি করতে চাইছিলেন না।”
“এ নিয়ে চাপ দিতে একজন বিচারকের কাছে যান মােহাম্মদ বিন সালমান। বিচারকও এ নিয়ে কথা বলতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না। তখন মােহাম্মদ বিচারকের টেবিলে রিভলবারের একটা বুলেট রাখেন। ইঙ্গিত ছিল, বিচারক তার কথা না মানলে হয়ত তাকে গুলি করা হবে।”
যুবরাজের এহেন আচরণ সম্পর্কে বাদশাহ আবদুল্লাহর কাছে অভিযোগ করেন বিচারক। এ খবর কখনাে অস্বীকার করেননি সালমান।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ:
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০১৮ সালের মে মাসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, “সৌদি সরকার ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ২ হাজার ৩০৫ জনকে আটক করেছে। যার মধ্যে ২৫১ জন তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন এবং তাদের কখনো বিচারকের সামনে হাজির করা হয়নি।
শুধু তাই নয়, নিউইয়র্কভিত্তিক ‘কমিটি ফর দ্য প্রটেকশন অফ জার্নালিস্ট’ও তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, সৌদি আরবে ২৬ জন সাংবাদিক বন্দি রয়েছেন।
এ ছাড়াও ২০১৯ সালে এক হাজার সৌদি নাগরিকের উপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল।
টিবিএম/জ/রা



