মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবং দুই লাখ কর্মী নিয়োগের বিতর্কিত দাবি ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। বিএনপি সরকারের ছয় মাসের মাথায় বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও নীতি-নির্ধারকের অপরিপক্ক মন্তব্য দেশে-বিদেশে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দাবি করেছিলেন যে, আগামী ছয় মাসে মালয়েশিয়া ২০০,০০০ বাংলাদেশি কর্মী নেবে। তবে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী আর রমানাথ এবং সরকারি মুখপাত্র ফাহমি ফাদজিল এই দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে এটিকে “অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বিএমইটি (BMET)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশে জনশক্তি রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। এই সময়ে মোট ৪,৯৯,৬৮০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৭,৩৯,৮৭০ জন। শ্রমবাজারের এই মন্দার মধ্যে সরকারের নীতি-নির্ধারকদের অসত্য আশ্বাস তরুণদের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় বিভ্রান্তি তৈরি করছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, নীতি-নির্ধারকদের উচিত দায়িত্বশীল ও বাস্তবসম্মত বক্তব্য উপস্থাপন করা।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অর্থনীতিবিদ এবং এসইবি (SEB) রিসার্চের বিশেষজ্ঞ বিজার্ন শিয়েলড্রপ সতর্ক করেছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালীতে গতিপথ বাধার কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ইকোনমিক প্রস্পেক্টস’ রিপোর্টে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। একই সাথে বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন ০.৮ শতাংশ কমিয়ে ৩.৮ শতাংশ করা হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতের স্থবিরতা এবং জ্বালানি সংকটের প্রভাবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এক গোলটেবিল বৈঠকে দাবি করেছেন, দেড় বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা তাদের রয়েছে এবং এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান নয়। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎচালিত যানবাহন, সৌর প্যানেল ও নবায়নযোগ্য শক্তি খাতে দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের প্রস্তুতি এবং বিনামূল্যে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা চলছে। তবে মালয়েশিয়া সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগতভাবে কর্মী নেওয়ার বিদেশি কোটা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার কঠোর ঘোষণা বহাল রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান অস্থিতিশীলতা এবং দেশের ভেতর জ্বালানি সংকটে স্থানীয় শিল্পকারখানার উৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে কর্মসংস্থান তৈরির গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে বাস্তবতার নিরিখে নীতি-নির্ধারণী বক্তব্য দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।



