বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আফগানিস্তানের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়াতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারা। ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের কঠোর ভিসা নীতি ও কূটনৈতিক সতর্কতার কারণে এত দিন দুই দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ সীমিত ছিল। তবে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই বরফ গলতে শুরু করেছে। ঢাকা ও কাবুলের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধিতে এখন বিশেষ সুযোগ দেখছেন ওষুধ ও তৈরি পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ধীরে ধীরে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আফগানিস্তানে ১৩ মিলিয়ন (১ কোটি ৩০ লাখ) ডলারের পণ্য পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগের অর্থবছরে (২০২৪-২৫) এই আয়ের পরিমাণ ছিল ১১ মিলিয়ন ডলার এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১০.১৬ মিলিয়ন ডলার। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর নজর অতটা না থাকলেও ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ধারণা, আগামী দুই-এক বছরের মধ্যে এই বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ১০ কোটি (১০০ মিলিয়ন) ডলারে পৌঁছানো সম্ভব। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের আকার বছরে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে।
আফগানিস্তানের প্রায় ৪ কোটি মানুষের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক ও ওষুধ খাতের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দেশটিতে বর্তমানে পাকিস্তান, ভারত, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের আধিপত্য রয়েছে। গত ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের মোট বৈদেশিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৩.৯৩ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে আমদানিই ১২.১২ বিলিয়ন ডলার। প্রায় ৩৭ লাখ প্রবাসী আফগান নিজ দেশে ফেরায় সেখানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির নেতারা মনে করছেন, করাচি ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করে নিয়মিত শিপমেন্ট পাঠানো গেলে চীনকে টেক্কা দিয়ে তৈরি পোশাক ও ওষুধের বাজার দখল করা সম্ভব।
অন্যদিকে, বাংলাদেশও আফগানিস্তান থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে সেরা মানের তাজা ও শুকনা ফল আমদানি করতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল, চীন, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও মিশর থেকে ফল কিনতে প্রতি বছর বাংলাদেশকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করতে হয়। কেবল ২০২১-২২ অর্থবছরেই ফল আমদানিতে প্রায় ৪৫ কোটি (৪৫০ মিলিয়ন) ডলার ব্যয় করেছিল বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের সুস্বাদু আপেল, ডালিম, নাশপাতি ও আঙুর সরাসরি আমদানি করা গেলে বাংলাদেশ যেমন সাশ্রয়ী মূল্যে ফল পাবে, তেমনি আফগান ব্যবসায়ীদের সঙ্গেও দূরত্বের টানাপোড়েন কমবে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যেও আফগানিস্তানের অর্থনীতি ৪.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতিসংঘের আর্থিক সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালেও দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ বজায় থাকবে। এছাড়া তালেবান পরিচালিত গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সে দেশে ১,৫০০ কিলোমিটারের বেশি নতুন রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। ইরান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের সঙ্গে তাদের নতুন রেল যোগাযোগ স্থাপিত হলে মধ্য এশিয়ার বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়ার পথ সহজ হবে বাংলাদেশের জন্য।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সমঝোতা কাবুলমুখী বাণিজ্যিক পথকে আরও মসৃণ করবে। আফগানিস্তানের ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা কার্পেট এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের দ্বিমুখী লেনদেন উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে। তাই দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ভিসা জটিলতা সহজ করার দাবি জানিয়েছেন দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়।



