মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় এক কঠিন কূটনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি বাংলাদেশ। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি রুখতে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে ঢাকা। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে একটি বিশেষ ছাড় (Waiver) পাওয়ায় আমদানির পথ প্রশস্ত হয়েছে। তবে ব্রাসেলস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সাথে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য সম্পর্কের স্বার্থ রক্ষা করে এই পদক্ষেপ নেওয়া এখন ঢাকার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য রুশ তেল আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ছয় সপ্তাহ ধরে চলা যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় বাংলাদেশ এই ছাড়ের আবেদন করেছিল। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কয়েকটি নির্দিষ্ট রুশ তেল কোম্পানির নামও প্রস্তাব করা হয়েছে, যাদের সাথে বাংলাদেশ আলোচনা করতে পারবে। তবে এই আমদানির সব ধাপ সম্পন্ন করে দেশে তেল পৌঁছাতে অন্তত এক মাস সময় লাগতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ মূলত সৌদি আরব ও কুয়েত থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে। রাশিয়ার তেলের স্পেসিফিকেশন ভিন্ন হওয়ায় চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি তা সরাসরি প্রক্রিয়াজাত করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রযুক্তিগত প্রশ্ন রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) কেবল সেই ধরনের রুশ তেলই আমদানির চেষ্টা করছে যা বিদ্যমান রিফাইনারিতে পরিশোধনযোগ্য। অন্যথায়, তৃতীয় কোনো দেশে এই তেল পরিশোধন করে নিয়ে আসার বিকল্পও ভাবা হচ্ছে।
আমদানির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হলো রাশিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। বাংলাদেশ যেহেতু আগে কখনও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করেনি, তাই পেমেন্ট সিস্টেম বা অর্থ পরিশোধের জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা (Special Payment System) এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ রাশিয়ার রফতানির ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখায়, এই লেনদেনটি যাতে কোনোভাবেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় না পড়ে, সে বিষয়ে ঢাকা ও মস্কো নিবিড়ভাবে কাজ করছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ও ইইউ-এর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২২ বিলিয়ন ইউরো, যার মধ্যে বাংলাদেশের রফতানিই ২০ বিলিয়ন ইউরো। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইইউ রাশিয়ার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছে। এই পরিস্থিতিতে রুশ তেল আমদানি করলে ব্রাসেলসের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে কূটনীতিক ও রফতানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে ইইউ যখন বাংলাদেশের সাথে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চাপ দিচ্ছে, তখন ভূ-রাজনৈতিক এই অবস্থান অত্যন্ত স্পর্শকাতর।
রাশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম ইতিমধ্যে রুশ তেল কোম্পানিগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি এর আগে কাতারে নিযুক্ত থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তার ভালো যোগাযোগ রয়েছে। তেলের পাশাপাশি তিনি কাজাখস্তান ও বেলারুশের সাথেও জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে কথা বলছেন। বিশেষ করে কাজাখস্তানের জ্বালানি মন্ত্রীর সাথে জি-টু-জি (G2G) ভিত্তিতে তেল আমদানির সম্ভাবনা নিয়ে চলতি মাসেই আরও বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটের সাথে বৈঠকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান জ্বালানি সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের জন্য বিশেষ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, কৃষিকাজে সেচের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করা খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থেই জরুরি। মার্কিন জ্বালানি সচিব বাংলাদেশের এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই কূটনৈতিক তৎপরতাই মূলত ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের ইতিবাচক সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বহুগুণ বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের মার্চ-জুন মেয়াদে তেল ও এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি গুনতে হতে পারে। এই বিপুল আর্থিক চাপ সামলাতে বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার সস্তা তেলের দিকে ঝুঁকছে সরকার।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডক্টর ইজাজ হোসেন মনে করেন, কেবল আমদানির ওপর নির্ভর না করে অভ্যন্তরীণ খরচ কমানোর দিকেও নজর দিতে হবে। তিনি অন্তত ২০ শতাংশ জ্বালানি সাশ্রয় করার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, সপ্তাহে তিন দিন ছুটি বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করে জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব। শুধু অফিস সময় কমিয়ে খুব বেশি লাভ হবে না যদি যানবাহন চলাচলের সময় একই থাকে।
পরিশেষে, রাশিয়ার তেল আমদানি এখন বাংলাদেশের জন্য একটি ‘ক্যাচ-২২’ পরিস্থিতি। একদিকে তীব্র জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ, অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা। আগামী তিন মাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ওয়েভার বাংলাদেশের জন্য সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির প্রয়োজন হবে।



