নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে গত কয়েক দিনের অস্থিরতা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে নিজের অবস্থান সুসংহত করলেন প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্টোফার লাক্সন। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) ওয়েলিংটনে ন্যাশনাল পার্টির সংসদীয় দলের (ককাস) এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে নিজের নেতৃত্বের ওপর আস্থা ভোট আহ্বান করেন তিনি। প্রায় আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার দীর্ঘ ও ‘উত্তপ্ত’ আলোচনা শেষে ভোটাভুটিতে জয়ী হয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকলেন। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং দলের ভেতর থেকে ওঠা গুঞ্জনের মুখে এটি ছিল লাক্সনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।
আস্থা ভোটের ফলাফল ঘোষণার পর পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে ক্রিস্টোফার লাক্সন বলেন, “গত এক সপ্তাহ ধরে আমার নেতৃত্ব নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছিল। সেই জল্পনার অবসান ঘটাতেই আমি নিজেই একটি আনুষ্ঠানিক আস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করি। আমার ককাস সদস্যরা অত্যন্ত পরিষ্কার এবং জোরালোভাবে আমার নেতৃত্বের প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছেন।” তবে ভোটের ব্যবধান কত ছিল তা তিনি প্রকাশ করেননি। যদিও দলের ভেতরের একটি সূত্র জানিয়েছে, ভোটটি ছিল প্রায় সর্বসম্মত।
লাক্সনের এই আকস্মিক পদক্ষেপ নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে বিরল। দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাসীন কোনো প্রধানমন্ত্রী সাধারণত নিজে থেকে এভাবে আস্থা ভোট আহ্বান করেন না। কিন্তু সাম্প্রতিক ‘১নিউজ-ভেরিয়ান’ জনমত জরিপে ন্যাশনাল পার্টির জনসমর্থন ৩০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়া এবং লাক্সনের ব্যক্তিগত রেটিং তলানিতে ঠেকায় দলের ভেতরে অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তিনি তা নেভানোর জন্য এই সাহসী বা কৌশলী পদক্ষেপ নিয়েছেন।
বৈঠকের পর ডেপুটি লিডার এবং অর্থমন্ত্রী নিকোলা উইলিস জানিয়েছেন, ককাস সদস্যরা লাক্সনের নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের দল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ। আমরা জনগণের সেবা এবং আসন্ন নির্বাচনের দিকে মনোনিবেশ করছি।” উল্লেখ্য, নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন আগামী ৭ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এমন নেতৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন ভোটারদের মাঝে বিরূপ বার্তা দিতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল।
তবে এই আস্থা ভোট জয় কেবল সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে। সরকারের অন্যতম মিত্র ও ‘নিউজিল্যান্ড ফার্স্ট’ দলের নেতা উইনস্টন পিটার্স এই ভোট আয়োজনকে ‘অহংকারী বোকামি’ (egotistical rubbish) বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, এর ফলে সরকারের স্থিতিশীলতা নিয়ে অহেতুক প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দল লেবার পার্টিও লাক্সনের এই জয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেছে, লাক্সন এখন কেবল নিজের পদ বাঁচাতেই ব্যস্ত, দেশ চালানোর দিকে তার মনোযোগ নেই।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, লাক্সন নেতৃত্বাধীন এই মধ্য-ডানপন্থী জোট সরকার ২০২৩ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয় এবং ধীরগতির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে জনগণের মাঝে সরকারবিরোধী মনোভাব দানা বাঁধছে। বিশেষ করে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা এবং আবাসন সংকটের মতো বিষয়গুলো লাক্সনের ইমেজে আঘাত হেনেছে। আজকের এই জয় তাকে ককাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ দিলেও জনমত ফেরানোর বড় পরীক্ষাটি এখনো বাকি।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, আলোচনার পরিবেশ ছিল ‘খোলামেলা ও গঠনমূলক’। কেউ কেউ নেতৃত্বের পরিবর্তন চেয়েছেন কি না তা স্পষ্ট না হলেও তারা ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করেছেন। পরিবহন মন্ত্রী ক্রিস বিশপ, যাকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল যে তিনি লাক্সনের জায়গা নিতে পারেন, তিনিও বৈঠকের পর প্রকাশ্যে লাক্সনকে সমর্থন জানিয়েছেন। বিশপ বলেন, “আমরা একটি টিম হিসেবে সামনের দিকে এগিয়ে যাব।”
বিশ্লেষকদের মতে, লাক্সন একজন সাবেক কর্পোরেট এক্সিকিউটিভ হিসেবে তার ‘ম্যানেজমেন্ট’ স্টাইল প্রয়োগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি চেয়েছিলেন গণমাধ্যমের জল্পনা বন্ধ করতে এবং ককাসকে একটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নিজের ক্ষমতা প্রমাণ করতে। তবে ভোটের গোপনীয়তা রক্ষা এবং বিরূপ আবহাওয়ার কারণে কয়েকজন সংসদ সদস্যের অনুপস্থিতি কিছুটা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আস্থা ভোটের এই নাটকীয়তা নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জন জ্যাকসন নামে একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন, “লাক্সন আজ জিতেছেন সত্য, কিন্তু তাকে মনে রাখতে হবে যে রাজনৈতিক দলগুলো খুব নিষ্ঠুর হতে পারে। যদি ভোটের সংখ্যা নভেম্বরের আগে না বাড়ে, তবে আজকের এই ঐক্য বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে পারে।”
পরিশেষে, ক্রিস্টোফার লাক্সন সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বৈঠকস্থল ত্যাগ করেন। তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, তিনি এই ইস্যুটিকে এখন ‘বদ্ধ অধ্যায়’ হিসেবে দেখতে চান। নিউজিল্যান্ডের এই রাজনৈতিক নাটকটি শেষ পর্যন্ত লাক্সনকে কতটা শক্তিশালী করল, তা বোঝা যাবে আগামী কয়েক সপ্তাহের নতুন জনমত জরিপে এবং সংসদের ভেতরে বিরোধীদের আক্রমণ সামলানোর মধ্য দিয়ে।



