― Advertisement ―

গাজা পুনর্গঠনে বড় উদ্যোগ: ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনায় ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’

গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নতুন করে অঞ্চলটিকে গড়ে তুলতে এক বিশাল কর্মযজ্ঞের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গঠিত বিশেষ সংস্থা ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি বোর্ড। প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দুবাইভিত্তিক বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর ও লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-এর সাথে এই সংক্রান্ত প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। গাজার সরবরাহ শৃঙ্খলা (সাপ্লাই চেইন) ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।

গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি হামলায় গাজা উপত্যকা আজ এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গাজার প্রায় ৮০ শতাংশ ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে অঞ্চলটির পুনর্গঠন এখন কেবল একটি আঞ্চলিক ইস্যু নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’ গাজাকে একটি সচল অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যেখানে আধুনিক লজিস্টিকস সুবিধা বিদ্যমান থাকবে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গাজার একটি অস্থায়ী বা স্থায়ী বন্দর পরিচালনা এবং ত্রাণ সামগ্রীসহ পুনর্গঠনের কাঁচামাল সরবরাহের জন্য একটি নিশ্ছিদ্র করিডোর তৈরি করা। ডিপি ওয়ার্ল্ড যেহেতু বিশ্বের অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে, তাই ট্রাম্প প্রশাসন মনে করছে তাদের সম্পৃক্ততা এই প্রকল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে। তবে এই আলোচনার বিষয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা ট্রাম্পের দল থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয় নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা অনুমান করা হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা অনুযায়ী, গাজাকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে অন্তত ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হতে পারে। এই বিশাল অংকের অর্থের যোগান দেওয়া এবং তা সঠিকভাবে ব্যয় করা একটি দুরুহ কাজ। ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অর্থ কেবল সরকারি অনুদান নয়, বরং বেসরকারি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের মাধ্যমে সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়া রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, ট্রাম্প প্রশাসন গাজা ইস্যুতে আরব দেশগুলোর বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। দুবাইয়ের এই প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তি গাজার পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে অনেক বেশি পেশাদার ও দ্রুত করতে পারে।

তবে এই বিশাল প্রকল্পের পথে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জগুলো এখনো পাহাড়সম। ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গাজার অভ্যন্তরীণ শাসনতান্ত্রিক জটিলতা এই পরিকল্পনার বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে। কোনো ধরনের টেকসই যুদ্ধবিরতি বা রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া গাজায় বড় ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন, ইট-পাথরের ভবন তোলা সহজ হলেও দীর্ঘমেয়াদী শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

ট্রাম্পের ‘শান্তি বোর্ড’ মূলত ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গাজা সমস্যার সমাধান করতে চাইছে। তাদের কৌশল হলো গাজাকে একটি ‘অর্থনৈতিক করিডোর’ হিসেবে গড়ে তোলা যা ইসরায়েল এবং প্রতিবেশী আরব দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিকভাবে সংযুক্ত থাকবে। যদি এই উদ্যোগ সফল হয়, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। বাণিজ্য ও লজিস্টিকস তখন সংঘাতের বদলে সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হবে।

আন্তর্জাতিক মহলে ট্রাম্পের এই ‘পিস থ্রু প্রসপারিটি’ বা সমৃদ্ধির মাধ্যমে শান্তি নীতি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। সমালোচকদের মতে, রাজনৈতিক অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নকে এড়িয়ে কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট মেটানো সম্ভব নয়। তবে পুনর্গঠনের অপেক্ষায় থাকা কয়েক লাখ গাজাবাসীর জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম আসা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে।

ফাইনান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে যে, এই আলোচনায় গাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। পুনর্গঠন প্রকল্পে স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের নিয়োগ দিয়ে বেকারত্ব কমানো এবং একটি দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে শান্তি বোর্ডের। সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করে গাজাকে একটি ‘স্মার্ট ইকোনমিক জোন’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা।

পরিশেষে বলা যায়, গাজা পুনর্গঠন নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও ট্রাম্পের শান্তি বোর্ডের এই আলোচনা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ৭০ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হবে কি না, তা নির্ভর করছে ভবিষ্যতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় সহযোগিতার ওপর। তবে বাণিজ্যিক লজিস্টিকসের মাধ্যমে শান্তির এই নতুন ফর্মুলা বিশ্ব রাজনীতির নজর এখন গাজার ধ্বংসস্তূপের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে।