নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের সাথে দেশটির মূল ভূখন্ডকে সংযুক্ত করেছে ‘চিকেন নেক’ নামক শিলিগুড়ি করিডোর। মাত্র ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জায়গা দিয়েই সাত রাজ্যের সাথে অখন্ডতা বজায় রাখে ভারত। কৌশলগত অবস্থানে থাকা এই ভূখণ্ডটি এর সংকীর্ণ আকৃতির কারণে ‘চিকেন নেক’ নামে পরিচিত।
এই ‘চিকেনস নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোর ঘিরে সম্প্রতি ভারতের কিছু সামরিক তৎপরতার খবর নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ। সম্প্রতি সীমান্তের কাছে আসাম ও উত্তর দিনাজপুরে দুটি আর্মি স্টেশন বা সেনা ঘাঁটি স্থাপনের কাজ শুরু করেছে ভারত। প্রতিবেদনের তথ্য মতে, সেনা ঘাঁটিগুলোতে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করার যথেষ্ট প্রমাণ মিলেছে।
বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তে যখন ভারতের সামরিক প্রদর্শনী চলছে, ঠিক তখনই দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে পাকিস্তানের একটি যুদ্ধজাহাজ। ১৯৭১ সালে যুদ্ধে পাকিস্তানের কাছ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়অর পর এই প্রথম কোনো পাকিস্তানি যুদ্ধজাহাজ বাংলাদেশের বন্দরে নোঙর করলো। পাকিস্তানি নৌবাহিনীর প্রধানও একই সময়ে ছিলেন বাংলাদেশ সফরে।

বাংলাদেশ ও ভারতে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, শিলিগুড়ি করিডোরের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই সম্ভবত ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মূল উদ্দেশ্য। একইসঙ্গে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এই সামরিক তৎপরতার পেছনে একটা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকে বরাবারই বার্তা দেওয়া হচ্ছে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়টা ভারত ‘অপেক্ষা’ করে কাটাতে চায়। বিভিন্ন বার্তায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর ভারত ‘নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে’ সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী।
সীমান্তে ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়ে বিশ্লেষকরা মনে করেন, চিকেন নেক তথা শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে খুবই স্পর্শকাতর এলাকা। এটি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বা সেভেন সিস্টার্সকে সংযুক্ত করেছে। আবার এই এলাকায় একাধিক দেশের সঙ্গে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। ফলে চীনের এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারের যে তৎপর রয়েছে, সেটিকে মোকাবিলাও ভারতের একটি বড় লক্ষ্য হতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ সীমান্তে ভারতের সামরিক তৎপরতা নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আলোচনা চলছে তখন লালমনিরহাটে সীমান্তের ৬২ কিলোমিটার ভারতের দখলে চলে গেছে এমন একটি গুজব ছড়ানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

এ বিষয়ে ১৫ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম জানিয়েছেন, লালমনিরহাট সীমান্ত নিয়ে ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘লালমনিরহাটেরে প্রায় ৬২ কিলোমিটার এলাকা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক দখল হয়ে আছে। এরকম একটি ফেব্রিকেটেড নিউজ আমাদের কাছে এসেছে। আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, এটা সম্পূর্ণ গুজব। এই এলাকার প্রত্যেকটা মানুষ সাচ্ছন্দ্যে এলাকায় আছে, বিজিবি টহলে আছে। বিজিবি সরে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।’
এদিকে ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে যে দুটি নতুন সেনা ঘাঁটি তৈরি করছে, এগুলো হলো আসামের ধুবরি এবং উত্তর দিনাজপুরে চোপরা সেনা ঘাঁটি। এই জায়গা দুটি বাংলাদেশ সীমান্তের খুবই কাছাকাছি।
এ বিষয়ে ভারতের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল দীপঙ্কর ব্যানার্জী বলেছেন, এটি এক ধরনের সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ। কৌশলগত শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের জন্য স্পর্শকাতর একটি জায়গা। তিনি বলেন, ‘বর্ডারে বিএসএফ এরই দায়িত্ব, সেনাবাহিনী ওখানে একেবারেই ডিপ্লয়েড নয়। এটা সাধারণ সময় আর্মির কোনো রেসপনসিবিলিটি নেই এখানে। তাদের কিছু এস্টাবলিশমেন্ট র্যাশনালাইজ করা হচ্ছে এখানে।’
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক মেজর জেনারেল নাইম আশফাক চৌধুরী ভারতের এই সামরিক তৎপরতাকে বাংলাদেশে কোনো অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দেখেন না। তবে তিনি সীমান্তের কাছে এ সামরিক পদক্ষেপের ‘সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য রয়েছে’ বলে মনে করেন। ভারতের সেনাঘাঁটি স্থাপনের উদ্যোগকে সামরিক পরিভাষায় বাংলাদেশের জন্য ‘গ্রে জোন ব্যাটল’ হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি।



