নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের চারটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে সরকার। তবে কি শর্তে বিদেশিদের কাছে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে তা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ব্যবসায়ী তথা দেশের মানুষের কাছে বিষয়টি অস্পস্ট থেকে যাচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলাা হচ্ছে, বন্দরের আধুনিকায়ন, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা এবং বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক অপারেটর নিয়োগ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ হলে বছরে ৩৩ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডল করা চট্টগ্রাম বন্দরের ৬০ শতাংশ কনটেইনারই ভবিষ্যতে হ্যান্ডল করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো। চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ না করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করায় বিষয়টিকে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে এর বিরোধিতা করছে বিভিন্ন সংগঠন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা নিয়ে বিদেশিদের সঙ্গে কেন এমন অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় চুক্তি হচ্ছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠান বাছাই করার আগে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা উচিত ছিল বলে তারা মনে করেন অনেক বিশেষজ্ঞ। টার্মিনালে বিদেশি পরিচালক এলেও তারা কি পরিমান বিনিয়োগ করবে, তাও প্রকাশ করা হয়নি। বিদেশি প্রতিষ্ঠান শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে সরকার কী ব্যবস্থা নেবে; বিদেশি অপারেটর এলে দেশের আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কতটা সাশ্রয়ী হবে— এসব বিষয়ে কিছুই প্রকাশ করেনি সরকার।
খোঁজ নিয়ে জানা যাচ্ছে, নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেতে যাচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং লালদিয়ার চরে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে ডেনিশ কোম্পানি এপি মোলার মায়ার্স বা এপিএম। এর মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি বর্তমানে চালু অবস্থায় রয়েছে। অন্যদিকে নতুন টার্মিনালটি হবে কর্নফুলী নদীর তীরে লালদিয়ার চর এলাকায়।
টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানি নিয়োগের প্রস্তুতির মধ্যে বন্দর ব্যবহারে ৪১ শতাংশ ট্যারিফ বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। এই বর্ধিত মাশুল নিয়েও আপত্তির কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

তাদের অভিযোগ, বিদেশি কোম্পানিকে বাড়তি সুবিধা দিতেই সরকার মাশুল বাড়িয়েছে। এছাড়া লাভজনক একটি চালু টার্মিনাল কেন বিনা দরপত্রে বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়া হবে সেই প্রশ্নও করছেন ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম পোর্ট ইউজার্স ফোরামের আহ্বায়ক আমীর হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী গণমাধ্যমে বলেছেন, বিদ্যমান ট্যারিফে বন্দর বছরে দুই হাজার কোটি টাকার বেশি মুনাফা করার পরেও ট্যারিফ বৃদ্ধি কার স্বার্থে সেই প্রশ্ন উঠেছে। তবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব মো. ওমর ফারুকের দাবি, মাশুল বৃদ্ধির সঙ্গে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের কোনো সম্পর্ক নেই।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ মাশুল বৃদ্ধির সমালোচনা করে বলেন, শতকরা ৪১ ভাগ মাশুল বৃদ্ধি কী কারণে করা হচ্ছে এটা একটা প্রশ্ন, ‘আমরা জানি মাশুল বৃদ্ধির বড় ধরনের একটা চেইন ইফেক্ট আছে। মাশুল বাড়ালে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের দাম বাড়বে। পাশাপাশি জিনিসপত্রের দামের ওপরে তার প্রভাব পড়বে। মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে যেটার কোনো যুক্তি নাই। শুধুমাত্র বিদেশি কোম্পানির স্বার্থ দেখা ছাড়া আর কোনো যুক্তি নাই’।
ব্যবসায়ী নেতা আমিরুল হক বলেন, ‘আমাদের বিদেশি অপারেটর দরকার ছিল অনেক আগে থেকে। আপনি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল দিতে চান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে। কি বেসিসে দেবেন? দেশের স্বার্থওতো দেখতে হবে। আবার এটাও দেখতে হবে, আপনি যাকে টার্মিনাল অপারেটর নিযুক্ত করেছেন সে যদি আপনার সাথে বৈরিভাবাপন্ন কোন দেশের অপারেটরের কাছে ওই অংশটা বিক্রি করে দেয় তখন আপনি কোথায় যাবেন?’
চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘যেহেতু সরকারের একটা জিটুজি সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে এটা হচ্ছে, তো যদি গ্লোবাল অপারেটর আসে আমাদের এখানে একটা ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার আছে। ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজারের সাথে তাদের যে নেগোসিয়েশন হবে সেখানে আসলে সবগুলো বিষয় উল্লেখ থাকবে।
তিনি আরো বলেন, কি কি পরিবর্তন তারা আনবেন, কি কি ফেসিলিটিজ এখানে প্রোভাইড করবেন কীভাবে চার্জ নেবেন সবকিছু সেখানে উল্লেখ থাকবে। এটা দেখতে হবে নেগোসিয়েশন ফেইজটা কীভাবে হয়, ফাইনালি চুক্তির পরে এটা বলা যাবে।’

বাংলাদেশ সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষের (বিডা) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বলেন, গাড়ি আমাদের, তারা শুরু ড্রাইভার। বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ করা হলে দুর্নীতিমুক্ত এবং উচ্চ কার্যক্ষমতা সম্পন্ন লজিস্টিক সিস্টেম তৈরি হবে। গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডের অপারেটর নিয়োগ দেওয়া হলে দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত হবে এবং সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করা সম্ভব হবে। বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে পোর্ট পরিচালিত হলে বাংলাদেশি কর্মী ও ব্যবস্থাপনা দলও দক্ষতা অর্জন করতে পারবে।
লালদিয়া চরে বিদেশিরা যে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ করছে তার মালিকানা প্রসঙ্গে আশিক চৌধুরী বলেন, মালিকানা বাংলাদেশের কাছেই থাকছে। লালদিয়া চরে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালস একটি নতুন টার্মিনাল নকশা ও নির্মাণ করবে। নির্মিত বিশ্বমানের এই টার্মিনালের মালিক হবে বাংলাদেশ। নির্মাণকাল তিন বছর। এরপর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব থাকবে এপিএম–এর হাতে। সময় শেষ হলে তারা সব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাবে।
চুক্তির মূল শর্তগুলো কি? জানতে চাইলে আশিক চৌধুরী বলেন, লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল একটি পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্রকল্প। প্রাইভেট পার্টনার এপিএম সাইনিং মানি হিসেবে ২৫০ কোটি টাকা এবং নির্মাণকালে মোট প্রায় ৬,৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। সরকার কোনো অর্থায়ন বা গ্যারান্টি দিচ্ছে না। নির্মাণ শেষে ৩০ বছরের জন্য চুক্তি থাকবে এবং শর্ত মানলে মেয়াদ বাড়ানো যাবে।
তিনি বলেন, যত বেশি কনটেইনার হ্যান্ডেল হবে, তত বেশি আয় হবে সরকারের। কনটেইনার হ্যান্ডেল না করতে পারলেও নির্দিষ্ট ন্যূনতম ভলিউম ধরে পেমেন্ট দিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।
বিদেশীদের হাতে বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব থাকলে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে বিডা প্রধান বলেন, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার নিরাপত্তা প্রটোকল অপরিবর্তিত থাকবে। টার্মিনালের পুরো প্রযুক্তিগত ও অপারেশনাল প্রক্রিয়ায় ডেটা লোকালাইজেশন, সাইবার নিরাপত্তা, ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই ও অ্যাক্সেস কন্ট্রোল নিশ্চিত করা হবে। সবকিছু সরকারের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই সম্পন্ন হবে।



