নিজস্ব প্রতিবেদক
গত বছর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই যেন ঝিমিয়ে পড়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তাদের নিস্ক্রিয়তার সুজোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছে দেশের অপরাধ জগৎ। গতকাল সোমবার (১০ নভেম্বর) রাজধানীতে প্রকাশ্য গুলিতে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নিহত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসছে প্রশাসন।
এদিকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আগামী মাসের যে কোনো দিন নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন সরকারের হাইকমান্ড।
ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনার পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এসেছে। ব্যক্তিগত ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্যের পাশাপাশি পতিত আওয়ামী লীগের ইন্ধন থাকার বিষয়ে তথ্য পেয়েছে পুলিশ। যারা ইন্ধন দিয়েছে তাদের নামও উদঘাটন করার দাবি করছে পুলিশ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্তারা বৈঠক করছেন। এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ড, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন সরকারের হাইকমান্ড।
সম্প্রতি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের গ্রেপ্তার হওয়ার পর অপরাধ জগতের নানা তথ্য এসেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ কয়েকটি স্থানে হত্যাকাণ্ড এবং গুলির ঘটনার পেছনে আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম উঠে এসেছে।
এদিকে গতকাল রাজধানীতে অন্তত ডজনখানের বিস্ফোরণ ও তিনটি স্থানে যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আদালতে যাওয়ার সময় পুরান ঢাকায় তারিক সাঈদ মামুনকে কমান্ডো স্টাইলে কয়েক’শ লোকের সামনে গুলি করে বীরদর্পে চলে গেছে খুনিরা।
এ ঘটনায় আন্ডাওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন গ্রুপ সম্পৃক্ত বলে নিহতের পরিবার দাবি করেছে।
পুলিশ বলছে, মামুন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ইমন বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করলেও অপরাধ জগতে সক্রিয় আছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টি বর্তমানে দুবাইয়ে অবস্থান করলেও তার সাঙ্গপাঙ্গরা অপরাধে সম্পৃক্ত আছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া শীর্ষ সন্ত্রাসীরা অপরাধ জগৎ ‘গরম’ করার পাঁয়তারা করছে। তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গেই আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ আছে বলে পুলিশ অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী ও তাদের গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে সম্প্রতি পুলিশের একটি ইউনিট একটি প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রচারণায় বাধা দেওয়া, ভোটারদের ভয় দেখানো বা বিরোধী পক্ষকে চাপে রাখতে আন্ডারওয়ার্ল্ডের সদস্যদের ভাড়াটে হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি আছে।
দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকা, দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এবার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। দেশের বাইরে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
সন্ত্রাসীরা অবৈধ চ্যানেলে সহযোগীদের কাছে দেশে অর্থ পাঠাচ্ছে, যা তাদের নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখা এবং আগামী নির্বাচনী কার্যক্রমকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। পাশাপাশি আওয়ামী লীগও তাদের কাজে লাগাচ্ছে।
অপরাধ জগতের কর্তা শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমন, সুব্রত বাইন, মোল্লা মাসুদ ও ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল গ্রুপের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দখলবাজির খবর বারবার সামনে আসে।
চলতি বছরের মাঝামাঝিতে কুষ্টিয়া থেকে সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদকে গ্রেপ্তার করা হয়। নজরদারি রাখা হয় আরও কয়েকজনকে। বিষয়টি টের পেয়ে দেশ ছেড়েছেন পিচ্চি হেলাল। যদিও এর আগেই তাকে দুই দফা হত্যার চেষ্টা চালায় ইমন গ্রুপের সদস্যরা।
একইভাবে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেজগাঁও সাত রাস্তায় (গতকাল আদালত পাড়ায় নিহত) মামুনকে লক্ষ্য করেও গুলি করে ইমন গ্রুপের সদস্যরা। তখন ইমন কারাগারে বন্দি ছিলেন। ওই ঘটনায় মামুন আহত হলেও পথচারী ভুবন চন্দ্র শীল নিহত হন।
এরপর আত্মগোপনে চলে যান মামুন। বাড্ডা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। গতকাল আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে ফিল্মি স্টাইলে গুলি চালিয়ে মামুনকে খুন করা হয়।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, রাজনৈতিক ময়দান উত্তপ্ত করতে আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে। তাদের দিয়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালানোর পাশাপাশি খুনোখুনিতে লিপ্ত থাকবে। বিষয়টি সরকারের হাইকমান্ডকে অবহিত করা হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর আন্ডারওয়ার্ল্ডে চলছে নতুন সমীকরণ। একদিকে জেল থেকে বের হয়ে অথবা দেশে এসেই এলাকায় একক আধিপত্য বিস্তার করতে চাইছেন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। এক সময়ে এসব সন্ত্রাসীর নির্দেশে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে এসেছেন তারাও এলাকার কর্তৃত্ব ছাড়তে নারাজ।
কারণ দখল, চাঁদাবাজি, খুনোখুনি, ভাড়ায় খাটা, আধিপত্যের লড়াইসহ নানা অপকর্মের মাঠ পর্যায়ের নিয়ন্ত্রক তারাই। এমন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন সময়ে দলছুট ক্যাডারদের কাছে টেনে নিচ্ছেন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ও দেশে ফিরে আসা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা, চাঁদার ভাগ বাড়ানো ও এলাকার নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়াসহ অত্যাধুনিক অস্ত্র হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, ‘সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি। পতিত আওয়ামী লীগ দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করলে কঠোরভাবে দমন করা হবে।’
তিনি আরো বলেন,‘সন্ত্রাসীদের ধরতে প্রতিদিনই অভিযান চালানো হচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ড বলতে কিছু বুঝি না। যারা দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে করবে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে পুলিশের সব ইউনিটকে বিশেষ বার্তা দেওয়া হয়েছে।’



