বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, অনন্য চারুশিল্পী, নাট্যনির্দেশক ও বাংলাদেশে আধুনিক পাপেট শিল্পের রূপকার মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। আজ সোমবার (২৯ জুন, ২০২৬) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। প্রখ্যাত এই সব্যসাচী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। বার্ধক্যজনিত নানাবিধ জটিলতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে আর ফিরে আসেননি এই গুণী জন। তাঁর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে তাঁর ভাগ্নি, বরেণ্য অভিনেত্রী নিমা রহমান জানান, হাসপাতাল থেকে মরদেহ প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদ ও পরবর্তীতে তাঁর বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হবে; এরপর পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জানাজা ও দাফনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
১৯autom৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে জন্ম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন একাধারে ভাষা সংগ্রামী, চিত্রশিল্পী, সুরসাধক ও টেলিভিশনের রূপকার। তাঁর পিতা, প্রখ্যাত কবি ও শিল্পরসিক গোলাম মোস্তফার শৈল্পিক আবহে বেড়ে ওঠার কারণে শৈশব থেকেই বাংলা সংস্কৃতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি তাঁর গভীর মায়ার সৃষ্টি হয়। ১৯৫২ সালে মাত্র নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাবস্থায় ভাষা আন্দোলনের সপক্ষে কার্টুন আঁকার অপরাধে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কোপানলে পড়ে মাসখানেক কারাবাস খাটেন এই তরুণ শিল্পী। পরবর্তীতে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী স্কটিশ চার্চ কলেজ ছেড়ে তিনি কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ফাইন আর্টসে ভর্তি হন এবং ১৯৫৯ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। চিত্রাঙ্কনে তাঁর জলরঙের মায়াবী কাজের প্রশংসা করে বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন, “মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্প রেখায় অনেক কথা বলতে পারে।”
১৯৬০ সালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসে চারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করলেও, ১৯৬৫ সালে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের (পিটিভি) ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল বৈরী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেও গণমাধ্যমের পর্দায় বাঙালি সংস্কৃতির ধারাকে বাঁচিয়ে রাখা। ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেন যে, তাঁরা পর্দায় পাকিস্তানের পতাকা দেখাবেন না। মুস্তাফা মনোয়ারের সুনিপুণ কৌশলে সেদিন রাত ১০টার অনুষ্ঠান টেনে ১২টা পার করে দেওয়া হয়, যাতে ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে ২৪ মার্চ হয়ে যায় এবং কৌশলে পাকিস্তান দিবসের পতাকা প্রদর্শন এড়ানো সম্ভব হয়। ওই মাসেই তাঁর যুগান্তকারী নির্দেশনায় ফজল-এ-খোদার রচনা ও আজাদ রহমানের সুরে প্রচারিত হয়েছিল ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’ গণসংগীতটি, যা দর্শকদের মাঝে এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি করেছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরের আতঙ্কগ্রস্ত শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে তিনি পাপেট প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলেন।
দেশ স্বাধীনের পর বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) উপ-মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এই দূরদর্শী শিল্পী রবীন্দ্রনাটক ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনুবাদে শেক্সপিয়ারের ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকের এমন কালজয়ী টেলিভিশন রূপ দেন, যা যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য মনোনীত হয়েছিল। শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের অনবদ্য আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’ এবং জনপ্রিয় পাপেট শো ‘মনের কথা’র স্রষ্টা ছিলেন তিনিই। দ্বিতীয় সাফ গেমসের অবিস্মরণীয় মাস্কট ‘মিশুক’ এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপটির স্থপতিও ছিলেন এই সব্যসাচী ব্যক্তিত্ব। পাপেট নিয়ে মস্কো ও তাসখন্দ সফর করে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতিকে তুলে ধরা এই শিল্পীর অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ দেখেই পরবর্তীতে ইউনিসেফ তাদের বিখ্যাত ‘মীনা’ কার্টুন চরিত্রটি নির্মাণে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।
বর্ণিল ও সফল কর্মজীবনে মুস্তাফা মনোয়ার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট ও এফডিসির শীর্ষ নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্পকলা ও সমাজ বিনির্মাণে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এছাড়া ১৯৯০ সালে টেনাশিনাস পদক, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ পুরস্কার এবং ২০০২ সালে শিশুকেন্দ্র থেকে বিশেষ সম্মাননাসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তাঁর এই চিরপ্রস্থান বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল, যা কোনোদিন পূর্ণ হওয়ার নয়।



