জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে পরিবহন ভাড়া নিয়ে সৃষ্টি হওয়া জটিলতা নিরসনে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল ২০২৬) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তেলের দামের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবহন ভাড়া এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যা জনজীবন ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের জন্যই যৌক্তিক হয়। সরকার কোনো একক পক্ষের স্বার্থ না দেখে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করছে।
উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে যাতায়াত ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে প্রভাব পড়া স্বাভাবিক। তবে এই সংকটকে পুঁজি করে কেউ যেন অযৌক্তিকভাবে ভাড়া বা দ্রব্যমূল্য না বাড়াতে পারে, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। বিশেষ করে এসি বাসের ক্ষেত্রে ভাড়া দুই বা তিন স্তরে নির্ধারণ করার একটি পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে, যা আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরের আগেই কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের সামর্থ্য ও বাসের মানের ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার বৈষম্য দূর হবে।
পরিবহন খাতের অস্থিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনেন। তিনি বলেন, সরকার কেবল ভোক্তার নয়, ব্যবসায়ীদেরও সরকার। একজন বাস বা ট্রাক মালিকও এই রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তার ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখাও সরকারের দায়িত্ব। তাই ভাড়া এমন এক পর্যায়ে নির্ধারণ করার চেষ্টা চলছে যেখানে মালিক ও শ্রমিকদের লোকসান হবে না, আবার সাধারণ যাত্রীদের ওপরও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হবে না। এটি একটি কঠিন ভারসাম্য হলেও সরকার তা অর্জনে বদ্ধপরিকর।
সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন যে, পণ্যবাহী ট্রাকের ভাড়া বৃদ্ধি সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই ট্রাকের ভাড়া নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে প্রতিটি মানুষকেই কিছুটা কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তিনি জনগণকে এই সংকটকালীন সময়ে ধৈর্য ধরার এবং কিছুটা ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখার আহ্বান জানান।
ঢাকার বাস টার্মিনালগুলোর পরিবেশ নিয়ে যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপদেষ্টা জানান, টার্মিনালগুলোতে বিশেষ করে টয়লেট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার মানোন্নয়নে সিটি করপোরেশনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আসন্ন ঈদ যাত্রায় ঘরমুখো মানুষ যেন টার্মিনালে মানসম্মত পরিবেশ পায়, তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। সিটি করপোরেশনের এই উদ্যোগগুলো নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
নিম্নবিত্ত মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষার আওতা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন বাজেটে আরও ৪০ লাখ মানুষকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর জন্য প্রায় ১৩ থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। যদিও আইএমএফের সাথে নেগোসিয়েশনে এই বরাদ্দ নিয়ে কিছুটা জটিলতা তৈরি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, কিন্তু সরকার দরিদ্র মানুষের পাশে থাকার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। প্রয়োজনে টিসিবির মাধ্যমে খাদ্য সহায়তা আরও বাড়ানো হবে।
ঢাকার ফুটপাত পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে একটি বিশেষ পরিকল্পনার কথা জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, হকারদের উচ্ছেদ না করে তাদের বিকল্প আয়ের উৎস হিসেবে ঢাকায় আটটি ‘নৈশ মার্কেট’ বা নাইট মার্কেট চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে হকাররা তাদের ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবে এবং ফুটপাতও পথচারীদের হাঁটার জন্য দখলমুক্ত থাকবে। এই সিদ্ধান্তটি হকার ও পথচারী—উভয় পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনবে।
ডিজিটাল সেবার ক্ষেত্রে ‘ফুয়েল পাস বিডি’ (Fuel Pass BD) অ্যাপের সফলতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, মোটরসাইকেল নিবন্ধনের কার্যক্রম এখন ঢাকার বাইরেও বিস্তৃত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মোটরসাইকেল নিবন্ধিত হয়েছে। যদিও সব জেলা থেকে এখনো সরাসরি জ্বালানি গ্রহণ শুরু হয়নি, তবে ঢাকার পাম্পগুলো থেকে নিবন্ধিত বাইকাররা অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন। দ্রুতই এই সেবাটি দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। তিনি উপদেষ্টার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপই জনকল্যাণমুখী। জ্বালানি তেলের বিশ্ববাজারের পরিস্থিতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে সরকারকে কিছু অপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হলেও, তার নেতিবাচক প্রভাব থেকে জনগণকে রক্ষা করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই সরকার সরাসরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণের কাছে তথ্য পৌঁছে দিচ্ছে।
পরিশেষে, ডা. জাহেদ উর রহমান আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ঈদকে কেন্দ্র করে কোনো অসাধু চক্র যেন ভাড়ার নৈরাজ্য তৈরি করতে না পারে, সে জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের তৎপরতা বাড়ানো হবে। সরকার সবার কম ক্ষতি হয় এমন একটি সমাধান পয়েন্টে পৌঁছাতে চায়। সঠিক নীতি নির্ধারণ এবং জনগণের সহযোগিতার মাধ্যমে এই জ্বালানি সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।



