রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে একটি বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) সন্ধ্যায় বনানী ১২ নম্বর রোডের কাঁচাবাজার সংলগ্ন ৪৪ নম্বর ভবনের ১১ তলায় এই আগুনের সূত্রপাত হয়। ভবনটির ওই তলায় থাকা একটি কাপড়ের গুদাম (গোডাউন) থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে। ১১ তলা থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জনাকীর্ণ এলাকা হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যে রাস্তার দুই পাশে উৎসুক মানুষের ভিড় জমে যায়, যা ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি চলাচলের ক্ষেত্রে কিছুটা বিঘ্ন সৃষ্টি করে। তবে দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, খবর পাওয়ার পর সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে বারিধারা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে আরও তিনটি ইউনিট যোগ দেয়। বর্তমানে মোট পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে একযোগে লড়াই করছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ১১ তলায় অবস্থিত কাপড়ের গুদাম হওয়ায় আগুনের তীব্রতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কাপড়ের স্তূপ থাকায় প্রচুর ধোঁয়া সৃষ্টি হয়েছে, যা ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ভবনের ভেতরে প্রবেশে বাধা দিচ্ছিল। জানালার কাঁচ ভেঙে এবং অক্সিজেন মাস্ক পরে কর্মীরা আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ভবনের অন্যান্য তলায় কোনো মানুষ আটকে আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। তবে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে বলে ধারণা করছেন ভবনের বাসিন্দারা। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তখনই ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ ও আগুনের প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বনানী এলাকাটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক—উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। ৪৪ নম্বর ভবনটিতে বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অফিস রয়েছে। সন্ধ্যার দিকে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটায় অনেক অফিসেই তখন কাজ চলছিল। আগুন লাগার সাথে সাথে ভবনের ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠায় অনেক কর্মী দ্রুত নিচে নেমে আসতে সক্ষম হন। এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডস্থলে পানির স্বল্পতা দেখা দিলে আশপাশের ভবন ও ওয়াসার পানির লাইনের সাহায্য নেওয়া হয়। বারিধারা স্টেশনের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকেও ব্যাকআপ ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা আশা করছেন, দ্রুতই আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। তবে ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এমন ঘনঘন অগ্নিকাণ্ড নিয়ে নগর পরিকল্পনাবিদরা বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। বনানীর মতো এলাকাতেও বহুতল ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাপড়ের গুদামগুলোতে দাহ্য পদার্থের উপস্থিতি বেশি থাকায় সেখানে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাত সোয়া ৭টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা আগুনের বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হয়েছেন। আগুনের শিখা যাতে নিচের তলাগুলোতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবক টিম উপস্থিত থেকে উদ্ধারকাজে সহায়তা করছে।
পরিশেষে বলা যায়, বনানীর এই অগ্নিকাণ্ড আবারও বহুতল ভবনের ফায়ার সেফটি অডিটের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। অল্পের জন্য বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি এড়ানো গেলেও, এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। ফায়ার সার্ভিসের পরবর্তী প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ভবনের মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, তা জানা যাবে।



