― Advertisement ―

ইসরায়েলি সংযোগ ও নাশকতার ছক: ইরানে দুই ‘মোসাদ এজেন্টের’ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

ইরানের বিচার বিভাগ জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার অভিযোগে এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার দায়ে দুই ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল ২০২৬) দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা ‘মিজান নিউজ এজেন্সি’র এক প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ওই দুই ব্যক্তি ইরানের ভেতরে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা ও গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত ছিলেন বলে দাবি করেছে তেহরান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মোহাম্মদ মাসুম শাহি এবং হামেদ ভালিদি। ইরানের প্রসিকিউটরদের অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁরা মোসাদের একটি সুসংগঠিত গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ইরানের প্রতিরক্ষা ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড চালানোর লক্ষ্যে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন। এই দণ্ড কার্যকর করার মাধ্যমে ইরান ইসরায়েলকে একটি কড়া বার্তা প্রদান করল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

বিচার বিভাগের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শাহি এবং ভালিদি কেবল গোয়েন্দাগিরিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁরা বিদেশের মাটিতে বিশেষ সামরিক প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেছিলেন। গোয়েন্দা তদন্তে উঠে এসেছে যে, তাঁরা ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইসরায়েলি প্রশিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের কারিগরি কৌশল রপ্ত করেন। কুর্দিস্তান অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ তেহরান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে ইসরায়েল এই অঞ্চলকে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য একটি ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি, এই গুপ্তচর নেটওয়ার্কটি অত্যন্ত আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম ব্যবহার করত এবং সরাসরি মোসাদ হ্যান্ডলারদের কাছ থেকে নির্দেশনা পেত। তারা ইরানের স্পর্শকাতর পারমাণবিক ও সামরিক তথ্য পাচারের চেষ্টার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু স্থানে বিস্ফোরণ ঘটানোর পরিকল্পনাও করেছিল। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বাহিনী তাদের কার্যক্রম শনাক্ত করতে সক্ষম হয় এবং চূড়ান্ত হামলার আগেই তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ছায়াযুদ্ধ এখন এক নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। তেহরান প্রায়ই তাদের দেশে সংঘটিত বিভিন্ন বিজ্ঞানী হত্যা বা সামরিক স্থাপনায় সাইবার হামলার জন্য সরাসরি মোসাদকে দায়ী করে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে শাহি ও ভালিদির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাকে ইরান তাদের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইরানের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন তুলে থাকে। তবে ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত এই চূড়ান্ত রায় প্রদান করেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যারা বিদেশের স্বার্থে নিজের দেশের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে কোনো নমনীয়তা দেখানো হবে না।

গত কয়েক বছরে ইরানে বেশ কয়েকজন কথিত মোসাদ এজেন্টের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। ইসরায়েল অবশ্য সচরাচর এই ধরনের গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করে না। তবে দুই দেশের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা এই ধরনের ঘটনাকে আরও উসকে দিচ্ছে। বিশেষ করে পারমাণবিক চুক্তি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে বিরোধ এখন চরমে।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা তৎপরতা নস্যাৎ করার ক্ষেত্রে ইরান তাদের গোয়েন্দা সক্ষমতার প্রদর্শনী করতে পছন্দ করে। শাহি ও ভালিদির মামলাটি সেই প্রচারণারই একটি অংশ। মিজানের প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে যে, এই নেটওয়ার্কের আরও কয়েকজন সদস্য এখনো নজরদারিতে রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

এই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ইরান যখন একের পর এক ‘ইসরায়েলি গুপ্তচর’ ধরার দাবি করে, তখন তা কূটনৈতিক উত্তজনা বাড়িয়ে দেয়। পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইরান তাদের কঠোর দণ্ডবিধি প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে—এটিই যেন রোববারের এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মূল নির্যাস।

পরিশেষে বলা যায়, মোহাম্মদ মাসুম শাহি এবং হামেদ ভালিদির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চিরশত্রুতার আরও একটি রক্তাক্ত অধ্যায়। তেহরানের বিচার বিভাগ তাদের সংবাদমাধ্যমে এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, যেকোনো ধরনের বৈদেশিক অনুপ্রবেশ ও নাশকতার চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।