ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় এক দুঃসাহসিক ও পৈশাচিক ঘটনার সাক্ষী হলো এলাকাবাসী। নিজ বাড়িতে দুই শিশু সন্তানের সামনে এক গৃহবধূকে রাতভর পালাক্রমে ধর্ষণের পর তাঁর স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে গেছে একদল দুর্বৃত্ত। এখানেই শেষ নয়, এই ঘটনার দুই দিন পর অভিযুক্তরা পুনরায় ওই বাড়িতে হানা দিলে বাধা দেওয়ায় গৃহবধূর পিতাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হয়েছে। এই নৃশংস ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) সকালে ভুক্তভোগী গৃহবধূ বাদী হয়ে মনপুরা থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অত্যন্ত তৎপরতার সাথে অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান আসামি মিরাজকে (২২) গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃত মিরাজ উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা কামালের ছেলে। পুলিশ তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (১০ এপ্রিল) দিবাগত রাত ১টার দিকে। মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগীর স্বামী চরাঞ্চলে মহিষ পালনের কাজ করেন এবং কাজের প্রয়োজনে সেখানেই রাত্রিযাপন করেন। ঘটনার রাতে ওই গৃহবধূ তাঁর ১০ বছরের শিশুকন্যা ও ছোট সন্তানকে নিয়ে বাড়িতে একা ছিলেন। গভীর রাতে মিরাজসহ ৩-৪ জন দুর্বৃত্ত প্রথমে সিঁদ কেটে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করে। তাতে ব্যর্থ হয়ে তারা ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে।
ঘরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা ১০ বছরের অবুঝ শিশুকন্যার সামনেই গৃহবধূর মুখ চেপে ধরে। এরপর পালাক্রমে তাকে পাশবিক নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়। নির্যাতনের পর যাওয়ার সময় তারা আলমারি ভেঙে স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়। যাওয়ার সময় তারা এই ঘটনা কাউকে না বলার জন্য প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
নৃশংস এই ঘটনার পর লোকলজ্জার ভয়ে ওই গৃহবধূ প্রথমে কাউকে কিছু বলতে পারেননি। তবে অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে ওত পেতে ছিলেন তাঁর বৃদ্ধ পিতা। ১২ এপ্রিল দিবাগত রাত ১০টার দিকে অভিযুক্ত মিরাজ ও তার সহযোগীরা পুনরায় ওই গৃহবধূর বাড়ির কাছে আসে। সম্ভবত তারা পুনরায় ধর্ষণের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল। এসময় গৃহবধূর পিতা মিরাজকে চিনে ফেলেন এবং তাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করেন।
পিতার বাধার মুখে ক্ষিপ্ত হয়ে মিরাজ তার কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে বৃদ্ধকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। তাঁর চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। তবে আঘাত গুরুতর হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সোমবার সকালে ভুক্তভোগী নারী নিজে বাদী হয়ে মনপুরা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং ডাকাতির অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। মামলায় মিরাজসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩-৪ জনকে আসামি করা হয়েছে। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে মামলার প্রধান আসামিকে তার নিজ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে।
মনপুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, অপরাধের ধরন অত্যন্ত গুরুতর। ভুক্তভোগী নারীকে ডাক্তারি পরীক্ষার জন্য ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরও জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে এবং বাকি আসামিদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
এদিকে, এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদে মনপুরার সাধারণ মানুষ ও সামাজিক সংগঠনগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। একটি জনবসতিপূর্ণ এলাকায় এভাবে ঘরে ঢুকে ধর্ষণের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ। তারা এই ঘটনার দ্রুত বিচার এবং জড়িত সকল আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
পরিশেষে বলা যায়, মনপুরার এই ঘটনা আবারও নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। স্বামী বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে যে বর্বরতা চালানো হয়েছে, তা সভ্য সমাজে অকল্পনীয়। পুলিশ প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং দ্রুত বিচারই পারে এমন অপরাধীদের মনে ভীতি সৃষ্টি করতে এবং ভুক্তভোগী পরিবারটিকে ন্যায়বিচার দিতে।



