বিশ্বরাজনীতির অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থার প্রভাবে বাংলাদেশের জ্বালানি বাজারে সৃষ্টি হয়েছে নজিরবিহীন সংকট। রাজধানী ঢাকার ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য যানবাহনের সারি এখন মাইলের পর মাইল ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বুধবার (১৫ এপ্রিল ২০২৬) তেজগাঁও ও মহাখালী এলাকার পাম্পগুলোতে দেখা গেছে এক চরম মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক চালক অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, তবুও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি মিলছে না অধিকাংশ জায়গায়।
তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ ১৩ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পেয়েছেন মোটরসাইকেল চালক আল আমিন হোসেন। তাঁর চোখে-মুখে ছিল চরম ক্লান্তির ছাপ। আল আমিন জানান, গতকাল দিবাগত রাত ১টার সময় তিনি লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। তপ্ত রোদে অভুক্ত অবস্থায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর আজ বেলা ২টার সময় তাঁর মোটরসাইকেলের ট্যাঙ্কি পূর্ণ করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, “খাওয়াদাওয়া নেই, রোদে দাঁড়িয়ে শরীর ভেঙে পড়ছে। শুধু চলার তাগিদে এই অমানবিক কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।”
আল আমিনের মতো শত শত চালক এখন ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপসের ওপর নির্ভরশীল। একবার তেল নিলে এক সপ্তাহ আর নেওয়া যাবে না—এমন কঠোর নিয়মের মধ্যেও তেলের নিশ্চয়তা মিলছে না। আল আমিন যখন লাইনে দাঁড়ান, তখন মোটরসাইকেলের সারি তেজগাঁও ছাড়িয়ে মহাখালী রেলগেট পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রাত পেরিয়ে সকাল, আর সকাল গড়িয়ে দুপুর হলেও লাইনের শেষ দেখা যাচ্ছিল না।
মহাখালী এলাকার চিত্র আরও ভয়াবহ। সেখানকার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনই এখন তেলের অভাবে বন্ধ। রয়েল ফিলিং স্টেশনের কর্মকর্তা স্বাধীন আহমেদ জানান, গত চার দিন ধরে তাঁদের পাম্পে কোনো জ্বালানি নেই। প্রতিদিন ডিপোতে গাড়ি পাঠিয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। এস আর এন্টারপ্রাইজ নামের আরেকটি পাম্পও তিন দিন ধরে বন্ধ। সাধারণ মানুষ এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে ছুটছেন, কিন্তু ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড তাঁদের হতাশ করছে।
তশোফা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক ইমরান হোসেন এই সংকটের একটি গাণিতিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, সরকার বর্তমানে ২০২৫ সালের চাহিদার সমানুপাতে তেল দিচ্ছে। কিন্তু বর্তমান চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। আগে যে ৯ হাজার লিটার তেল দিয়ে তিন দিন চালানো যেত, এখন তা মাত্র কয়েক ঘণ্টাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় পাম্পগুলো দিনের অধিকাংশ সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
মেসার্স সোহাগ ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার রঞ্জন সূত্রধর জানান, গত ১২ এপ্রিল সামান্য কিছু অকটেন পেলেও তা মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায়। আজ পেট্রল পাওয়া গেলেও অকটেনের সরবরাহ মেলেনি। ফলে অকটেন চালিত আধুনিক গাড়ি ও মোটরসাইকেল মালিকরা পড়েছেন চরম বিপাকে। এই সরবরাহ ঘাটতি কেবল পাম্প মালিকদের নয়, বরং সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রাকে অচল করে দিচ্ছে।
অফিসগামী মানুষদের ভোগান্তি আরও চরমে। ইউরেকা এন্টারপ্রাইজ ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা কামরুল হাসান জানান, তিনি অফিস থেকে বিশেষ ছুটি নিয়ে দুই ঘণ্টা ধরে রোদে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মতে, আশপাশের পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় সচল পাম্পগুলোতে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়েছে। এতে করে যানজট ও জনভোগান্তি উভয়ই প্রকট আকার ধারণ করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় এই ধাক্কা সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে এসে লেগেছে। বৈশ্বিক এই অস্থিরতা কতদিন চলবে তা অনিশ্চিত হওয়ায় দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। অনেকেই বলছেন, তেল নেওয়ার এই পদ্ধতি আরও সহজতর করা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে জনজীবনে স্থবিরতা নেমে আসবে। বর্তমানে রাজধানীর সড়কগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি কেবল জ্বালানি সংকটেরই নয়, বরং সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বেরও প্রতিফলন ঘটাচ্ছে।



