ইউরোপীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের আবহে স্লোভাকিয়ার প্রধানমন্ত্রী রবার্ট ফিকো হাঙ্গেরির নবনির্বাচিত নেতা পিটার ম্যাগয়ারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার জোরালো প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সোমবার (১৩ এপ্রিল ২০২৬) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ফিকো এই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। হাঙ্গেরির সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে পিটার ম্যাগয়ারের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর স্লোভাক প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি দুই প্রতিবেশী দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিবৃতিতে রবার্ট ফিকো পিটার ম্যাগয়ারকে তাঁর অসাধারণ নির্বাচনী জয়ের জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি উল্লেখ করেন যে, স্লোভাকিয়া এবং হাঙ্গেরির মধ্যে যে ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক বন্ধন রয়েছে, তা নতুন নেতৃত্বের অধীনে আরও সুদৃঢ় হবে। ফিকো আশা প্রকাশ করেন যে, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান “নিবিড় সহযোগিতা” কেবল বজায় থাকবে না, বরং তা নতুন মাত্রা পাবে।
একই সাথে স্লোভাক প্রধানমন্ত্রী হাঙ্গেরির বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ ১৬ বছর হাঙ্গেরির শাসনভার সামলানো অরবানের সাথে ফিকোর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক রসায়ন ছিল বেশ চমৎকার। অরবানের আমলে দুই দেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক নীতিতে একমত পোষণ করেছিল। ফিকো তাঁর বিবৃতিতে অরবানের দীর্ঘমেয়াদী অবদান এবং স্লোভাক-হাঙ্গেরি সম্পর্কের উন্নয়নে তাঁর ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
পিটার ম্যাগয়ারের এই বিজয়কে ইউরোপীয় রাজনীতিতে একটি বিশাল পরিবর্তনের সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা অরবানের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ম্যাগয়ারের দল বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছে। এই পরিবর্তন হাঙ্গেরির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে যেমন প্রভাব ফেলবে, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে দেশটির সম্পর্ককেও নতুন দিকে মোড় দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্লোভাক প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যেকোনো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি খাতে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ফিকো স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, নতুন সরকারের সাথেও তিনি জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষায় যৌথ উদ্যোগ এবং পারমাণবিক ও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ চালিয়ে যেতে চান।
বিশ্লেষকদের মতে, অরবানের আমলে হাঙ্গেরি ও ফিকোর নেতৃত্বে স্লোভাকিয়া—উভয় দেশই রাশিয়ার সঙ্গে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করা এবং রাশিয়ার তেল-গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বজায় রাখা ছিল এই দুই দেশের অভিন্ন বৈশিষ্ট্য। এখন পিটার ম্যাগয়ারের নেতৃত্বে হাঙ্গেরি সেই ‘রাশিয়া-ঘনিষ্ঠ’ নীতি থেকে সরে আসে কি না, সেটিই এখন দেখার মূল বিষয়।
ফিকো বিশ্বাস করেন, নেতৃত্বের পরিবর্তন হলেও দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ অপরিবর্তিত থাকবে। বিশেষ করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সংখ্যালঘু অধিকার এবং বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে স্লোভাকিয়া বরাবরের মতোই হাঙ্গেরিকে পাশে পাবে। হাঙ্গেরির নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীও প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক রাখার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এই ঐতিহাসিক জয় হাঙ্গেরির জন্য এক নতুন ভোরের সূচনা করেছে। পিটার ম্যাগয়ার তাঁর নির্বাচনী প্রচারণায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন রবার্ট ফিকোর মতো অভিজ্ঞ নেতার সহযোগিতার প্রস্তাব তাঁর জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি ইতিবাচক শুরু হতে পারে। দুই দেশের এই সম্ভাব্য ঐক্য মধ্য ইউরোপের রাজনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে।
পরিশেষে, রবার্ট ফিকোর এই বার্তাটি কেবল একটি সৌজন্যমূলক অভিনন্দন নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত আহ্বান। মধ্য ইউরোপের দেশগুলো যখন জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন স্লোভাকিয়া ও হাঙ্গেরির মতো প্রতিবেশী দেশের ঐক্য অপরিহার্য। পিটার ম্যাগয়ার এই সহযোগিতার আহ্বানে কীভাবে সাড়া দেন, তা নির্ধারণ করবে আগামীর ইউরোপীয় কূটনীতির নতুন মানচিত্র।



