ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়ায় নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইরানের সাথে চলমান সাময়িক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না। হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ইঙ্গিত দেন, এই অমীমাংসিত পরিস্থিতিকে দীর্ঘায়িত করার চেয়ে তিনি একটি চূড়ান্ত এবং স্থায়ী পরিণতির দিকেই দেশকে নিয়ে যেতে আগ্রহী। এবিসি নিউজের সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট জনাথন কার্লের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) জনাথন কার্ল উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতিকে নিরর্থক বলে মনে করছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প একটি রহস্যময় এবং নাটকীয় পূর্বাভাস দিয়ে বলেছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিশ্ববাসী এমন কিছু দেখতে যাচ্ছে যা আগে কখনো কল্পনাও করা যায়নি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব রাজনীতিতে এক ধরনের রণসজ্জার আবহ তৈরি হয়েছে। তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে দাবি করেছেন, চলমান এই সংকটের সমাপ্তি খুব নিকটবর্তী।
ট্রাম্পের বিশ্লেষণে বর্তমান সংকট সমাধানের কেবল দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমটি হলো—একটি অত্যন্ত কঠোর ও টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানো যা মার্কিন স্বার্থকে শতভাগ রক্ষা করবে। আর দ্বিতীয় পথটি হলো—পুরোদমে সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতাকে ধূলিসাৎ করে দেওয়া। যদিও তিনি সামরিক শক্তির কথা বলেছেন, তবে ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে কূটনীতি ও চুক্তির পথকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্পের মূল্যায়ন বেশ ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, তেহরানের শাসনব্যবস্থায় গত কয়েক বছরে আমূল পরিবর্তন এসেছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ইরানি প্রশাসনের ভেতরে থাকা কট্টরপন্থী ও উগ্রবাদী অংশটি এখন কোণঠাসা কিংবা নির্মূল হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনের ফলে একটি নতুন চুক্তি সম্পাদনের পথ প্রশস্ত হয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। ট্রাম্পের মতে, একটি ভালো চুক্তির মাধ্যমে ইরান পুনরায় বিশ্ব অর্থনীতির মূলধারায় ফিরতে পারে এবং নিজেদের দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ পেতে পারে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিজের নেতৃত্বের অপরিহার্যতা নিয়ে একটি সাহসী দাবি করেছেন। তিনি বলেন, যদি তিনি এই মুহূর্তে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট না থাকতেন, তবে পৃথিবী এতদিনে ভয়াবহ সংঘাত ও বিশৃঙ্খলায় ছিন্নভিন্ন হয়ে যেত। নিজের কঠোর পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করে তিনি জানান, তাঁর আপসহীন অবস্থানের কারণেই আজ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো বৈশ্বিক বিপর্যয় বা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান কেবল ইরান নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। ইসরায়েল ও আরব দেশগুলো এখন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়। ট্রাম্পের ‘অভাবনীয় ঘটনার’ পূর্বাভাসটি কোনো নির্দিষ্ট সামরিক অপারেশন না কি কোনো নাটকীয় শান্তি প্রস্তাব, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
আন্তর্জাতিক সমর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্প হয়তো ইরানের ওপর আরও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু সামরিক স্থাপনায় সীমিত হামলার পরিকল্পনা করছেন। তবে ট্রাম্পের ‘ডিল মেকিং’ ইমেজের কারণে অনেকে মনে করছেন, এটি ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে টেবিলের অপর পাশে নিয়ে আসার একটি বড় কৌশলও হতে পারে। ট্রাম্প সবসময়ই আলোচনার টেবিলে নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখতে পছন্দ করেন।
ইরান ইস্যু ছাড়াও ট্রাম্পের এই বক্তব্যের সময় চীন ও রাশিয়ার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের তিক্ততার বিষয়টিও উঠে এসেছে। ট্রাম্পের দাবি, তাঁর হাত ধরেই আমেরিকা পুনরায় বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ফিরে পেয়েছে। তিনি মনে করেন, মিত্র দেশগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ বোধ করছে কারণ আমেরিকা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে।
বর্তমানে পুরো বিশ্ব তাকিয়ে আছে আগামী দুই দিনের দিকে। হোয়াইট হাউস থেকে কোনো দাপ্তরিক আদেশ আসে না কি পেন্টাগন কোনো বিশেষ মুভমেন্ট শুরু করে, তা নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ চলছে। ট্রাম্পের এই ‘অপেক্ষা করুন এবং দেখুন’ নীতি আন্তর্জাতিক বাজার এবং কূটনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। ইরান যদি ট্রাম্পের দেওয়া শর্তে রাজি না হয়, তবে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।
পরিশেষে বলা যায়, ট্রাম্পের এই বার্তা কেবল একটি আল্টিমেটাম নয়, বরং এটি বিশ্ব ব্যবস্থার এক সন্ধিক্ষণ। ইরান যদি এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে চুক্তিতে না আসে, তবে ট্রাম্পের ভাষায় ‘military option’ বা সামরিক পথটিই হতে পারে চূড়ান্ত নিয়তি। ওয়াশিংটনের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে আগামীর বিশ্বশান্তি।



