― Advertisement ―

বৈশ্বিক বৈষম্যের বিষবাষ্প: তলানিতে উন্নয়নশীল দেশের স্বপ্ন, শীর্ষে ধনীদের আধিপত্য

বিশ্বজুড়ে সম্পদ ও সুযোগের সুষম বণ্টনের যে স্লোগান আমরা নিয়মিত শুনে থাকি, বাস্তবতার রুক্ষ জমিনে তার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সম্পদশালী রাষ্ট্র এবং প্রান্তিক অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কেবল কমছেই না, বরং তা এক বিপদজনক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক কাঠামোয় ধনীরা আরও বিত্তবান হচ্ছে, আর গরিব দেশগুলো ঋণের জালে এবং দারিদ্র্যের চক্রে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়ছে।

গত এক বছরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল পরিবর্তনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাকে এখন কেবল ‘রাজনৈতিক স্টান্ট’ ছাড়া আর কিছুই ভাবার অবকাশ নেই। আইএমএফ কিংবা বিশ্বব্যাংকের মতো সংস্থাকে আরও গণতান্ত্রিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক করার কথা থাকলেও, তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন এখনো দৃশ্যমান হয়নি। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো যখনই কোনো সংকটে পড়ছে, তাদের জন্য সাহায্যের হাত বাড়ানোর পরিবর্তে শর্তের কঠিন শিকল পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বাস্তবায়নহীন প্রতিশ্রুতি মূলত পিছিয়ে পড়া দেশগুলোকে এক গভীর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল বৈশ্বিক এই স্থবিরতার নেপথ্যে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে দায়ী করেছেন। তার মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও আদর্শিক লড়াইয়ের খেসারত দিচ্ছে স্বল্প আয়ের দেশগুলো। বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য কোনো প্রকল্প বা সামাজিক উন্নয়নের জন্য তহবিল সংগ্রহ করা আগের চেয়ে অনেক বেশি দুঃসাধ্য ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া বা বড় বিনিয়োগ আনা এখন কেবল স্বপ্নের মতোই অলীক মনে হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনটির ভিত্তি হলো স্পেনের সেভিল শহরে গত বছর গৃহীত এক রূপরেখা। সেই সময় সেভিল অ্যাকশন প্ল্যানকে ভাবা হয়েছিল বৈষম্য নিরসনের ম্যাজিক ফর্মুলা হিসেবে। লক্ষ্য ছিল ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (SDG) অর্জন করা। কিন্তু বর্তমান মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, সেই পরিকল্পনার গতিপথ এখন লক্ষ্যচ্যুত। সেভিলে যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে শীতল ঘরে বন্দি হয়ে আছে। ২০৩০ সালের মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর বৈষম্যহীন পৃথিবী গড়ার যে স্বপ্ন জাতিসংঘ দেখেছিল, তা এখন কেবল কাগুজে দলিলে পরিণত হতে চলেছে।

আগামী সপ্তাহটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে বসন্তকালীন বৈঠকে বসতে চলেছেন বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শীর্ষ কর্মকর্তারা। এই বৈঠকের ঠিক পূর্বমুহূর্তে জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। এটি মূলত একটি শক্তিশালী ‘ওয়েক-আপ কল’ বা সতর্কবার্তা। যারা বৈশ্বিক অর্থ ব্যবস্থার নাটাই ধরে আছেন, তাদের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা কি কেবল গুটিকয়েক উন্নত রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করবেন, নাকি পুরো বিশ্বের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবেন?

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যদি এখনই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন নীতিতে স্বচ্ছতা ও মানবিকতা না আনা হয়, তবে বিশ্ব এক নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির চাপে উন্নয়নশীল দেশগুলো যখন নাভিশ্বাস তুলছে, তখন আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থার এই ঢিলেমি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। উন্নয়ন ও বৈষম্য নিরসনের এই ম্যারাথনে গরিব দেশগুলো কেবল দর্শক সারিতেই থেকে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে আরও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ঋণের বোঝা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। অনেক দেশ তাদের বাজেটের বড় একটি অংশ ব্যয় করছে ঋণের সুদ মেটাতে, যা শেষ পর্যন্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো মৌলিক খাতগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বৈশ্বিক ঋণ কাঠামোতে সংস্কার এবং সুদ মওকুফের মতো সাহসী পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। কিন্তু ধনী দেশগুলো এখনো তাদের পুরনো কর্তৃত্ববাদী অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।

ভূ-রাজনীতি যখন উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তখন সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয়। বর্তমান বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তারে যতটা তৎপর, প্রান্তিক মানুষের দারিদ্র্য বিমোচনে ততটা আন্তরিক নয়। জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনটি আসলে সেই অমানবিক সত্যকেই প্রকাশ করেছে। উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে আমরা পিছিয়ে নেই, বরং উল্টো পথে হাঁটছি—এই রূঢ় বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

পরিশেষে বলা যায়, ২০৩০ সালের সময়সীমা ফুরিয়ে আসছে। আমাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে—হয় আমরা প্রতিশ্রুত সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে একটি সাম্যভিত্তিক বিশ্ব গড়ব, অথবা গুটিকয়েক দেশের আধিপত্য বজায় রেখে বাকি বিশ্বকে ধ্বংসের কিনারে ফেলে দেব। জাতিসংঘের এই নতুন মূল্যায়ন আমাদের সামনে সেই কঠিন আয়না ধরেছে, যেখানে আমাদের ব্যর্থতার কঙ্কালসার চেহারাটা অত্যন্ত স্পষ্ট।