― Advertisement ―

প্রয়াত ভার্গাস ইয়োসা ও চীনা পাঠকদের হৃদয়ের সম্পর্ক

লেখক: শু লিউলিউ ও লি ইউচে, গ্লোবাল টাইমস অবলম্বনে বিশেষ প্রতিনিধিঃ
পেরুভিয়ান সাহিত্যিক মারিও ভার্গাস ইয়োসার মৃত্যু সংবাদ শুনে ৪৩ বছর বয়সী চীনা পাঠক ঝাও শিউইং তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করেছিলেন এভাবে “মনে হচ্ছিল, যেন আমার হৃদয়ে একটা আলো নিভে গেছে”। ১৩ এপ্রিল লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের এই নোবেলজয়ী পুরোধা লেখক পেরুর লিমায় ৮৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সারা বিশ্বের ন্যায় অসংখ্য চীনা পাঠকও শোকাহত হন—পাঠক ঝাও তাঁদের মতোই একজন।


ভার্গাস ইয়োসার জীবন ছিল বহুমাত্রিক। কখনো তিনি নাটক লিখেছেন, কখনো আবার ব্যাংকের ক্লার্ক হিসেবে কাজ করেছেন। এমনকি ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। এই ব্যস্ত জীবনের মাঝেও তিনি তাঁর দৃষ্টি ফিরিয়েছেন চীনা পাঠকদের দিকে। সাহিত্যে নোবেল জয়ের ঠিক এক বছর পর, ২০১১ সালে তিনি চীন সফরে করেছিলেন। এ সময় তিনি চীনা পাঠকদের উদ্দেশে একটি বিশেষ চিঠিও লেখেন, যেখানে উল্লেখ করেছিলেন: “সাহিত্য একটি বিশ্বজনীন ভাষা।” অর্থ্যাৎ কলমের কোনো সীমানা নেই।

চীনের সঙ্গে কীভাবে সংযোগ:
২০১১ সালের গ্রীষ্মকালের কথা। ঝাও, যিনি লেখকের এক নিবেদিত পাঠক, তাঁর এক প্রকাশক বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পারেন যে ভার্গাস ইয়োসা চীন সফরে আসছেন মাত্র সপ্তাহখানেকের জন্য। যদিও তিনি সফরের নির্দিষ্ট সূচি খুঁজে পাননি। তবে সত্যিই লেখক চীনে এসেছিলেন। তিনি বক্তৃতা দেন সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটি এবং সাংহাই থিয়েটার একাডেমিতে। এসময় নিজের লেখার একটি পাঠ-অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তিনি।

এই অনুষ্ঠানগুলোতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, লেখক, পাঠক ও সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ ছিল। এই উচ্ছ্বাসে ভীষণভাবে মুগ্ধ হন লেখক ভার্গাস ইয়োসা। সবার প্রশ্নের পৃথকভাবে উত্তর দিতে না পারলেও তিনি একটি খোলা চিঠির মাধ্যমে চীনা পাঠকদের সঙ্গে আন্তরিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিলেন।

চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, চীন তাঁর কল্পনার দুনিয়ায় দেখা “রূপকথার মতো ও অবিশ্বাস্য দেশগুলোর” মতোই একটি “বাস্তব ও অপরিসীম শক্তিধর” দেশ। তিনি কখনো ভাবেননি, তাঁর গল্প “এত দূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।”


২০১১ সালের সফরের আগেই, ১৯৭০ দশকের শেষদিকে চীনে তাঁর লেখার আবির্ভাব ঘটে। ফরেইন “লিটারেচার অ্যান্ড আর্ট ” নামে একটি চীনা পত্রিকায় তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল।

ওই সময় লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিক জাগরণ তুঙ্গে। এর অন্যতম কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন ভার্গাস ইয়োসা। চীনা পাঠকদের মধ্যেও তাঁর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। ১৯৮০ সালে তাঁর উপন্যাস “দ্য টাইম অফ দ্য হিরো” চীনা ভাষায় অনূদিত হয়। অনুবাদ করেন খ্যাতনামা স্প্যানিশ অনুবাদক ঝাও ডেমিং, যিনি বিচিত্রভাবে ভার্গাস ইয়োসার মৃত্যুর মাত্র ১০ দিন আগে মারা যান—“দ্য পেপার ” পত্রিকার তথ্য।


যদিও ঝাও আর নেই, কিন্তু তাঁর অনুবাদে ভার্গাস ইয়োসার সাহিত্য চীনে আজও বেঁচে আছে। শি’আন ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির স্প্যানিশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ইয়োসার অনুবাদক হোউ জিয়ান গ্লোবাল টাইমস-কে জানান, তিনি ২০১৯ সালে মাদ্রিদে ভার্গাস ইয়োসার বাসায় গিয়ে তাঁকে সাক্ষাৎকার দেন।

তিনি লেখককে জিজ্ঞেস করেন, কেন তিনি সাক্ষাৎকারে রাজি হয়েছেন। উত্তরে ইয়োসা বলেন, ‘কারণ আগে কোনো চীনা অনুবাদক আমার বাসায় আসেননি। আমি চীনকে জানতে চেয়েছিলাম—জানতে চেয়েছিলাম আমার বইগুলো কীভাবে অনূদিত হচ্ছে, কেমনভাবে গ্রহণ করছে পাঠকরা।’


হোউ আরও বলেন, লেখকের সঙ্গে কথোপকথনে তিনি বুঝতে পারেন যে ভার্গাস ইয়োসার চীনা সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। তাঁর লেখায় চীনা চরিত্র—প্রায়শই মুদি দোকানের মালিক ইত্যাদি ভূমিকায়—ঘুরে ফিরে আসে। হোউ জানান, একবার ইয়োসা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন তিনি “চিফা” শব্দটি চেনেন কিনা। এটি পেরুভিয়ান স্প্যানিশে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যার উৎস চীনা ভাষা থেকে এবং এটি পেরুভিয়ানধর্মী চাইনিজ খাবার বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।

মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক:
গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস যেখানে মিথ ও বাস্তবতার স্বপ্নিল মিশ্রণে লেখেন, কার্লোস ফুয়েন্তেস যিনি লাতিন আমেরিকা ও ইউরোপের সাহিত্যিক সম্পর্ক অন্বেষণ করেন, সেখানে ভার্গাস ইয়োসাকে বলা হয় সাহিত্যের কাঠামোগত স্থপতি।


তাঁর উপন্যাসগুলোতে বহুতর কাহিনী-সূত্রের বিস্তার দেখা যায়। যা প্রায়শই সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে। তাঁর প্রিয় উপন্যাসগুলোর একটি “কনভারসশেন ইন দ্য ক্যাথেড্রাল” বা “ক্যাথেড্রালে কথোপকথন”। এতে একাধিক চরিত্রের জীবনের টানাপোড়েনকে যুক্ত করে পেরুর সমাজ বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করা হয়েছে।


হোউ বলেন, ভার্গাস ইয়োসা ছিলেন “একজন বিশ্বজনীন চিন্তাবিদ।” তিনি পেরু, লাতিন আমেরিকা, এমনকি পরে গৃহীত স্পেনের নাগরিকত্বের মধ্য দিয়ে সেখানকার সমাজ পরিবর্তনকেও বিশ্লেষণ করেছেন।


এই লেখক নৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, কিন্তু মানব মর্যাদা ও ন্যায়ের প্রতি কোনো আপস করেননি। তাঁর সাহিত্যকর্মে নিহিত এই বিশ্বজনীন মূল্যবোধ পাঠকদের জাতি-সীমা অতিক্রম করে আকৃষ্ট করেছে। হোউ বলেন, “তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রা আমাদের বৈশ্বিক যুগে সাংস্কৃতিক সম্মিলনের প্রতিচ্ছবি।”


তিনি আরও বলেন, “লাতিন আমেরিকান সাহিত্য জাগরণের লেখকরা, যেমন ইয়োসা, সফল হয়েছেন কারণ তাঁরা নিজেদের সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেননি এবং আবার সেই শিকড়কেও ছাড়েননি। বরং তাঁরা উভয়কে একীভূত করেছেন।”


তরুণ হৃদয়ে এখনও প্রাসঙ্গিক:
তরুণ চীনা পাঠক টাং ই গ্লোবাল টাইমস-কে বলেন, তিনি যখন “দ্য ফেস্ট অব দ্য গোট” বা “ছাগলের উৎসব” পড়েন, তখন দেখেন, ভিন্নতর লেখকদের মতো শুধু সমালোচনাই নয়, বরং ইয়োসার চরিত্রদের মধ্যে সবসময় একধরনের আশার অনুসন্ধান থাকে।


১৯৯৭ সালে ইয়োসা “লেটার টু দ্য ইয়ং নোভেলিস্ট বা একজন তরুণ ঔপন্যাসিকের কাছে চিঠি নামে একটি অ-কাল্পনিক বই লেখেন, যেখানে তিনি “কাহা চিনা” নামে একটি কাহিনিবিন্যাস কৌশলের কথা বলেন। এর সরল ব্যাখ্যা হলো—একটি মূল গল্পের ভেতরে আরেকটি গল্প বা উপগল্প সৃষ্টি হয়, এবং এই গল্পগুলো একে অপরকে প্রভাবিত করে চলে।

তরুণ চীনা পাঠক টাং ই বলছিলেন, ‘বিশ্বের প্রতি জিজ্ঞাসু না হলে, এমন একটি কৌশলও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। তাই, কীভাবে লেখা উচিত, তার চেয়ে বরং ইয়োসা আমাদের শেখান একজন লেখকের চিন্তা করার পদ্ধতি কেমন হওয়া উচিত’।