ঢাকা ও সিউলের মধ্যকার চিরাচরিত সাহায্য-ভিত্তিক সম্পর্কটি এখন সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তি-কেন্দ্রিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশেই সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই নতুন কূটনৈতিক হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন প্রশাসন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় রাষ্ট্রপতি লি জে মিউংয়ের সরকার পারস্পরিক স্বার্থ সুরক্ষায় অর্থনৈতিক কূটনীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বিশেষ করে সিউলের নতুন ‘গ্লোবাল সাউথ’ নীতি ঢাকার জন্য দ্বিপাক্ষিক সুবিধা আদায়ের একটি বড় কৌশলগত হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
উভয় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে বর্তমানে কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (CEPA) বা সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির চূড়ান্ত খসড়া তৈরির কাজ চলছে, যা ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ স্বাক্ষরিত হতে পারে। বর্তমানে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৩ বিলিয়ন ডলারের ঘরে থাকলেও, আগামী ২০২৮ সালের মধ্যে তা ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে গিয়ে এখন জাহাজ নির্মাণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো উচ্চ-মূল্যের খাতগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্যিক রোডম্যাপ সাজানো হচ্ছে।
জনশক্তি রপ্তানি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন এই অংশীদারিত্বের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত প্রায় ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশির একটি বড় অংশ উৎপাদন ও কৃষি খাতে যুক্ত থাকলেও, এখন কোরিয়ান স্থানীয় সরকারের সাথে চুক্তির মাধ্যমে জাহাজ নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ খাতে দক্ষ কর্মী নেওয়ার নতুন দুয়ার খুলেছে। চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ভাষার কঠোর নিয়ম ও লাইসেন্সিং জটিলতা থাকলেও তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রকৌশলীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে। পাশাপাশি, কোরিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তির সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অন্যদিকে, ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে সিউলের সমর্থন অব্যাহত রয়েছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি জাতিসংঘে প্রতিটি প্রস্তাবে ঢাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জোরদার করতে আসিয়ান (ASEAN) জোট ও মিয়ানমারের সাথে সিউলের যে নিবিড় কূটনৈতিক সংযোগ রয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে কোরিয়াকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত কোরিয় উপদ্বীপ গঠন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রক্ষায় ঢাকা সিউলের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।



