ডেস্ক রিপোর্ট: বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্প্রতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪৫ জন পলাতকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, গত জুলাই-অগাস্ট মাসে দেশে সংঘটিত গণহত্যার সঙ্গে তারা জড়িত ছিলেন। আদালত নির্দেশ দিয়েছে, আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে এই পলাতকদের আদালতে হাজির করতে হবে। এর পরই প্রশ্ন উঠেছে, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বা ভারত-বাংলাদেশ বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরত আনা কতটা সম্ভব।
ইন্টারপোলের রেড নোটিশ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন (ইন্টারপোল) সারা বিশ্বে পলাতক অপরাধীদের ধরতে সহায়তা করে। রেড নোটিশ জারি হলে ইন্টারপোলের ১৯৪ সদস্য দেশ পলাতক ব্যক্তির সম্পর্কে সতর্ক হয় এবং তাদের নজরদারির আওতায় আনে। তবে রেড নোটিশ সরাসরি কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার বা ফেরত আনার ক্ষমতা দেয় না। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সহযোগিতার একটি মাধ্যম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ পুলিশের সদর দপ্তর থেকে ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আশাবাদী যে এই নোটিশের মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ অন্য পলাতক আসামিদের অবস্থান শনাক্ত এবং গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
তবে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদার মতে, রেড নোটিশ জারি হলেও এটি সফল হতে অনেকগুলো বিষয় নির্ভর করে। তিনি বলেন, “ইন্টারপোল শুধু তথ্য সরবরাহ করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশকে পলাতকদের আটক করতে সহায়তা করে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি রাজনৈতিক কারণে পলাতক হন, তবে তাকে ফেরত আনা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।”
ভারত-বাংলাদেশ বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি
২০১৩ সালে ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে একটি বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী, ফৌজদারি মামলার আসামি বা দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে হস্তান্তরের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে “রাজনৈতিক অপরাধ” বলে বিবেচিত হলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রয়েছে উভয় দেশের।
ভারত ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছে যে শেখ হাসিনা তাদের দেশে অবস্থান করছেন। এই অবস্থায় কেন বাংলাদেশ বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তির পরিবর্তে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারির দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, “প্রত্যর্পণ চুক্তি বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। আর ইন্টারপোলের মাধ্যমে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। আমরা সব প্রক্রিয়াই অনুসরণ করব।”
রাজনীতির প্রভাব ও আইনি জটিলতা
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ূন কবির মনে করেন, শেখ হাসিনার মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ফেরত আনার বিষয়টি শুধু আইনি নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকও। তিনি বলেন, “ভারত যদি কোনো রাজনৈতিক কারণে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে না চায়, তাহলে তারা চুক্তি বাস্তবায়নে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। এটি অনেকটাই দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক বোঝাপড়ার ওপর নির্ভর করছে।”
অন্যদিকে, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক নূরুল হুদা বলেছেন, “রেড নোটিশ থাকলেও সেটি সফল হতে সংশ্লিষ্ট দেশের বিচার ব্যবস্থার সমর্থন প্রয়োজন। ভারত যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে না চায়, তাহলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হতে পারে।”
অতীত অভিজ্ঞতা
ইন্টারপোলের রেড নোটিশের মাধ্যমে বাংলাদেশ এর আগে ১৭ জন পলাতককে দেশে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াটি বরাবরই জটিল। ২০১৫ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছিল। কিন্তু আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তিনি সেই তালিকা থেকে তার নাম সরাতে সক্ষম হন।
আরেকটি উদাহরণ হলো, ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আবুল কালাম আযাদকে ধরতে ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারি করেছিল। কিন্তু আজও তাকে দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরাতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ বা বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তি যেকোনো প্রক্রিয়াই গ্রহণ করা হোক না কেন, এটি একটি দীর্ঘ এবং জটিল পদ্ধতি। রাজনীতির প্রভাব, দুই দেশের সম্পর্ক এবং কূটনৈতিক জটিলতা এখানে বড় ভূমিকা পালন করবে।
সরকারের আইন উপদেষ্টা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে সব আইনি প্রক্রিয়াই অনুসরণ করা হবে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি সমাধান সহজ হবে না এবং শেখ হাসিনাকে ফেরানোর বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।



