দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পুঞ্জীভূত পাহাড় ক্রমেই আরও অনিয়ন্ত্রিত ও বিপজ্জনক রূপ ধারণ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতের এই খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়, যা দেশের আর্থিক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা ও তারল্য সংকটের গভীরতাকে জনসমক্ষে উন্মোচিত করেছে। এর আগের প্রান্তিকে অর্থাৎ গত ডিসেম্বর শেষে এই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণকৃত ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি বা অনাদায়ী ঋণে পরিণত হয়েছে। খাতভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৪৬ শতাংশই এখন খেলাপি, যার মোট আর্থিক মূল্য ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।
ঐতিহাসিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত সাড়ে ১৫ বছরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রশ্রয়েই ব্যাংকিং খাতে এই খেলাপি ঋণের বিস্তার ঘটেছিল। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তখন ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। কিন্তু দীর্ঘ দেড় দশকে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাবে ২০২৪ সালের জুনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রাক্কালে সেই খেলাপি ঋণ উন্নীত হয় ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকায়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত ও স্বচ্ছ গোপন তথ্য (Actual Data) প্রকাশ শুরু করলে খেলাপি ঋণের আসল ও ভয়াবহ রূপটি সামনে আসে।
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারদের মতে, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত স্মরণকালের বৃহত্তম কিছু আর্থিক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতিই আজকের এই সংকটের মূল কারণ। বিশেষ করে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, বিসমিল্লাহ গ্রুপ এবং হল-মার্ক গ্রুপের মতো নির্দিষ্ট কিছু বৃহৎ শিল্প গোষ্ঠী কর্তৃক বেনামি ও ভুয়া ঋণের নামে ব্যাংক খাতের অর্থ আত্মসাৎ এর জন্য দায়ী। এর পাশাপাশি ন্যাশনাল ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক এবং বেসিক ব্যাংকে সংঘটিত পদ্ধতিগত জালিয়াতি ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবেই দেশের ব্যাংকিং খাত আজ এই দেউলিয়া অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।



