― Advertisement ―

চীনের কয়লাখনিতে প্রলয়ংকরী বিস্ফোরণ, নিহত ৯০; দেড় দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা

চীনের উত্তরাঞ্চলীয় শানসি প্রদেশের একটি কয়লাখনিতে এক প্রলয়ংকরী ও ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ৯০ জন খনি শ্রমিকের নির্মম মৃত্যু হয়েছে। বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলো এই ঘটনাকে গত দেড় দশকের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় এবং রক্তক্ষয়ী খনি দুর্ঘটনা বলে অভিহিত করেছে। স্থানীয় সময় আজ শনিবার (২৩ মে, ২০২৬) বিকেল পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলের মাটির গভীরে আটকা পড়াদের উদ্ধারে শতশত উদ্ধারকর্মী ও জরুরি যানবাহন নিয়ে এক শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান সচল রাখা হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সিসিটিভির (CCTV) বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২০ ঘণ্টা আগে যখন খনির ভেতরে আকস্মিক এই বিস্ফোরণটি ঘটে, তখন ভূগর্ভের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে প্রায় ২৫০ জন শ্রমিক জীবনঝুঁকি নিয়ে কাজ করছিলেন।

প্রাদেশিক জরুরি ব্যবস্থাপনা দফতরের তথ্য অনুযায়ী, শানসি প্রদেশের কিনইউয়ান কাউন্টির চাংশি শহরে অবস্থিত ‘লিউশেনইউ’ (Liushenyu) নামক কয়লাখনিতে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। এরপর থেকে আজ সকাল পর্যন্ত খনি গর্ভ থেকে অন্তত ২০১ জন হতাহত শ্রমিককে উদ্ধার করে মাটির ওপরে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছেন উদ্ধারকর্মীরা। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে গুরুতর দগ্ধ ও আহত ১২৩ জন শ্রমিককে স্থানীয় বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের অনেকেরই অবস্থা আশঙ্কাজনক। তবে বিস্ফোরণের সময় খনির ভেতরে অবস্থান করা মোট ২৫০ জন শ্রমিকের সবাইকে সম্পূর্ণ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে কি না, নাকি এখনো কেউ বিষাক্ত ধোঁয়ার মাঝে নিখোঁজ আছেন, তা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো স্পষ্ট করা হয়নি।

এই নজিরবিহীন খনি ট্র্যাজেডির পরপরই চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়ার (Xinhua) মাধ্যমে এক জরুরি ডিক্রি জারি করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তিনি নিখোঁজ ও খনিতে আটকা পড়া শ্রমিকদের অক্ষত অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ‘সর্বাত্মক ও আধুনিক উদ্ধার অভিযান’ পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি এই বর্বরোচিত ঘটনার নেপথ্যের কারণ উদঘাটনে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘পূর্ণাঙ্গ তদন্ত’ কমিটি গঠন এবং খনি কর্তৃপক্ষের অবহেলা প্রমাণিত হলে দোষীদের কঠোরতম শাস্তির আওতায় এনে দায় নির্ধারণের নির্দেশও দিয়েছেন। সিনহুয়ার প্রাথমিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বিস্ফোরণের ঠিক আগে লিউশেনইউ কয়লাখনির ভেতরে প্রাণঘাতী কার্বন মনোক্সাইড (CO) গ্যাসের মাত্রা নির্ধারিত আন্তর্জাতিক সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা এই বিস্ফোরণের অন্যতম কারণ হতে পারে।

ফরাসি সংবাদ সংস্থা এএফপির (AFP) ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবারের এই বিস্ফোরণটি ২০০৯ সালের পর চীনের খনি শিল্পে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এর আগে ২০০৯ সালে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হেইলংজিয়াং প্রদেশের একটি কয়লাখনিতে ঘটে যাওয়া স্মরণকালের ভয়াবহ বিস্ফোরণে ১০৮ জন শ্রমিক নিহত হয়েছিলেন। এই দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা আহত শ্রমিক ওয়াং ইয়ং চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিসিটিভিকে তাঁর লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, “হঠাৎ করেই খনির ভেতর একটি বিশালাকার ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হয় এবং আমরা তীব্র সালফারের গন্ধ পাই। নিজে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে চোখের সামনে ধোঁয়ায় অনেক সহকর্মীকে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ছটফট করতে দেখেছি।” ওয়াং আরও জানান, তিনি প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকার পর চেতনা ফিরে পান এবং পাশের কয়েকজন অর্ধচেতন সহকর্মীকে ডেকে তুলে একসাথে কোনোমতে খনি থেকে সুড়ঙ্গ বেয়ে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।