― Advertisement ―

বেলারুশে রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন; পুতিন-লুকাশেঙ্কোর যৌথ হাইপারসনিক মহড়ায় ন্যাটোর হুঁশিয়ারি

ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছর পেরিয়ে বৈশ্বিক পরাশক্তি রাশিয়ার পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শনের নতুন কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে প্রতিবেশী বেলারুশ। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় ও বিপজ্জনক মোড় নিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রাশিয়ার কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যৌথ মহড়ায় সরাসরি অংশ নিয়েছেন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। পূর্ব ইউরোপের সমভূমি থেকে শুরু করে সুদূর প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত এই নজিরবিহীন ও বিশাল সামরিক মহড়াটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং লুকাশেঙ্কো। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর (NATO) সাথে চলমান চরম উত্তেজনার পারদকে মহাকাশচুম্বী করে এই মহড়ায় রাশিয়ার শত শত অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী যান, পরমাণু সক্ষম যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ এবং সাবমেরিন অংশ নেয়। মহড়া শেষে ৭১ বছর বয়সি বেলারুশীয় প্রেসিডেন্ট জানান, তারা কোনো দেশকে সরাসরি হুমকি দিচ্ছেন না, তবে যেকোনো মূল্যে বেলারুশের ব্রেস্ট সীমান্ত থেকে রাশিয়ার ভ্লাদিভোস্টক পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের অভিন্ন পিতৃভূমি রক্ষা করতে তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

দীর্ঘদিন ধরে মস্কোর বিপুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা ভোগ করলেও ‘ইউরোপের শেষ স্বৈরাচার’ হিসেবে পরিচিত লুকাশেঙ্কো নিজের সব রাজনৈতিক গুটি এক চালের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। পুতিনের ওপর বেলারুশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও রাশিয়ার সাথে বেলারুশকে প্রশাসনিকভাবে একীভূত করার চাপ তিনি বরাবরই অত্যন্ত চতুরতার সাথে এড়িয়ে গেছেন। এমনকি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চিরবৈরী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মিনস্কের সম্পর্কের একধরনের প্রচ্ছন্ন উষ্ণতাও দেখা গেছে। ঠিক এমন এক সমীকরণের মাঝেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই পরমাণু মহড়ার গুরুত্ব তুলে ধরে জানান, কৌশলগত পারমাণবিক বাহিনীর সার্বিক প্রস্তুতির স্তর আরও বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। চলমান ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সাজানো এই মহড়ার অংশ হিসেবে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে ‘ইয়ার্স’ (Yars) নামক আন্তঃমহাদেশীয় হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ করা হয়, যা মাত্র ২০ মিনিটেরও কম সময়ে প্রায় ৫,৭৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মূল উদ্বেগের কারণ হলো, মস্কো ইতিমধ্যেই বেলারুশকে পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম আধুনিকায়িত এসইউ-২৫ (Su-25) যুদ্ধবিমান এবং ৫০০ কিলোমিটার পাল্লার ধ্বংসাত্মক ‘ইস্কান্দার-এম’ (Iskander-M) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, ইউক্রেন সীমান্ত থেকে মাত্র ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আসিপোভিচি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার এই কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রগুলো মজুত রাখা হয়েছে। হঠাৎ কোনো সুনির্দিষ্ট বাহ্যিক উসকানি ছাড়াই রাশিয়ার পক্ষ থেকে বেলারুশের মাটিতে এভাবে পারমাণবিক অস্ত্র মোতায়েন এবং এই যৌথ মহড়াকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জার্মানির ব্রেমেন ইউনিভার্সিটির প্রখ্যাত গবেষক নিকোলে মিত্রোখিন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পর্দার আড়ালে বড় ধরনের কোনো ভূ-রাজনৈতিক চুক্তি বা ঘটনা ঘটছে যা বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হতে চলেছে।

অন্যদিকে বেলারুশ সীমান্ত সংলগ্ন ন্যাটোর নতুন মহাসচিব মার্ক রুট কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে মস্কো যদি কোনোভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তবে ন্যাটোর সম্মিলিত পাল্টা প্রতিক্রিয়া হবে রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত বিধ্বংসী। সুইডেনের হেলসিংবার্গে ন্যাটো পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ সম্মেলনকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে লক্ষ্য করেই রাশিয়া ও বেলারুশ এই মহড়ার সময় নির্ধারণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, কিয়েভসহ ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চলে নতুন করে বড় ধরনের কোনো যৌথ স্থল আক্রমণ চালানোর অংশ হিসেবেই রাশিয়া বেলারুশকে এই আগ্রাসনে টেনে আনছে। তবে সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে বেলারুশে অবস্থানরত রুশ সেনাবহর নতুন কোনো পূর্ণাঙ্গ আক্রমণের জন্য পর্যাপ্ত নয় এবং ইউক্রেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়া লুকাশেঙ্কোর জন্য রাজনৈতিকভাবে আত্মঘাতী হবে। ফলে এই মহড়াকে অনেকেই পশ্চিমাদের ভয় দেখানোর জন্য রাশিয়ার ‘অস্ত্রের ঝনঝনানি’ বা ফাঁকা আওয়াজ বলে মনে করছেন।