ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে শত শত একর কৃষি জমি এখন চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। আমন মৌসুমের উপযুক্ত সময় পেরিয়ে গেলেও জলাবদ্ধতা এবং মেঘনা নদীর জোয়ারের লবণাক্ত পানি জমে থাকায় উপজেলার হাজারো কৃষক এখনো আমন চারা রোপণ করতে পারেননি। দীর্ঘদিনের এই সংকটের ফলে উপকূলীয় এই অঞ্চলের কৃষকরা চরম আর্থিক লোকসান ও ভবিষ্যৎ জীবিকা নিয়ে গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রতি বছর একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী কোনো সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় আমন ফলনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলার হাজিরহাট, মনপুরা, উত্তর সাকুচিয়া ও দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন ফসলের মাঠ ঘুরে দেখা যায় এক ভয়াবহ চিত্র। কোথাও হাঁটু সমান পানি, আবার কোথাও এক থেকে দুই ফুট পানি জমে কৃষকের জমিগুলো জলাশয়ে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে জোয়ারের নোনা পানি কৃষি জমিতে প্রবেশ করায় চারা রোপণের পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কিছু জমিতে চারা রোপণ করলেও নোনা পানির প্রভাবে সেই চারাগুলো হলুদ বর্ণ ধারণ করে শুকিয়ে মরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, সার ও শ্রমের উচ্চমূল্যের এই সময়ে উৎপাদন খরচ বাড়লেও প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বাধার কারণে ফলন না পাওয়ায় কৃষকরা পুঁজি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্যমতে, বর্তমান বেড়িবাঁধ বা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের ফলে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো বন্ধ হয়ে গেছে, যা মাঠজুড়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি করছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অযত্ন ও সংস্কারের অভাবে স্লুইস গেটগুলো অকেজো হয়ে পড়ায় জোয়ারের সময় অনায়াসেই লবণাক্ত পানি ফসলি জমিতে ঢুকে পড়ছে। এতে জমির উর্বরতা শক্তি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদী ফসল ফলানোর ক্ষমতা হারাচ্ছে। কৃষকদের দাবি, পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণ এবং ত্রুটিপূর্ণ স্লুইস গেটগুলো দ্রুত সংস্কার করা হলে কৃষকরা পুনরায় ফসল ফলাতে সক্ষম হবেন এবং উপকূলের এই অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।
সংকটের বিষয়ে মনপুরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান তাওহীদ জানান, বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং মাঠপর্যায়ে কৃষি বিভাগ প্রতিনিয়ত কৃষকদের সার্বিক পরামর্শ ও তদারকি প্রদান করছে। কৃষকদের এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার কথা এবং এর প্রভাব সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তবে কেবল পরামর্শ নয়, দ্রুত পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো মেরামতের দাবি জানিয়েছেন উপকূলের প্রান্তিক চাষিরা, যেন আগামী দিনের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় এবং কৃষকদের আর্থিক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।



