সাজ্জাদুর রহমান
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার দেউলবাড়ী ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে এখন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন একদল কৃষক। তাদের মূল কাজ জলাভূমি থেকে টেপাপোনা সংগ্রহ করা। কখনও ছোট নৌকায়, কখনও বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে তারা এই জলজ উদ্ভিদ তুলে আনেন। এই টেপাপোনাই এখন তাদের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
দেউলবাড়ী ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকায় প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষক নিয়মিতভাবে টেপাপোনা সংগ্রহ ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তারা নেমে পড়েন জলাশয়ে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভর্তি করে টেপাপোনা নিয়ে যান বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারে। সেখানেই ক্রেতাদের কাছে বিক্রি হয় এই জলজ উদ্ভিদ।
প্রতিটি ট্রলারে সংগ্রহ করা টেপাপোনার দাম পড়ে প্রায় ৪০০০ থেকে ৪৫০০ টাকা পর্যন্ত। স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী কেউ কেউ অর্ডার নিয়েও সরাসরি সরবরাহ করেন। এই আয়ে অনেক পরিবার এখন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা জানান, টেপাপোনা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান, যা পচে জৈবসারে পরিণত হয়। সবজির চাষে, বিশেষ করে ধান, আলু, বেগুন ও শাকসবজির জমিতে এটি ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা বেড়ে যায়।
স্থানীয় কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা আগে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতাম। খরচও বেশি হতো, ফলনও কম। এখন টেপাপোনা ব্যবহার করছি—ফলন ভালো, জমিও উর্বর হচ্ছে।
টেপাপোনা শুধু সার হিসেবেই নয়, জলাশয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতেও ভূমিকা রাখে। এটি পচে মাটিতে জৈব উপাদান যোগ করে এবং পানি পরিশুদ্ধ রাখে।
নাজিরপুরে টেপাপোনার চাহিদা বাড়ছে। ফলে এখন অনেকেই জলাভূমিতে নিজেরাই টেপাপোনা চাষ শুরু করেছেন। এতে একদিকে আয় হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকদের সার সংগ্রহে সুবিধা হচ্ছে।
বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারে টেপাপোনা ক্রয় করতে আসা এক কৃষক জানান,
আগে টেপাপোনা কেউ তেমন গুরুত্ব দিত না। এখন এটি বিক্রি করে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা আয় হচ্ছে। কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন, আমরা ও ফসল উৎপাদন করে লাভ পাচ্ছি।
তবে টেপাপোনা সংরক্ষণ ও পরিবহনে কিছু সমস্যা রয়ে গেছে। দ্রুত পচনশীল হওয়ায় দীর্ঘ সময় রাখা যায় না। এছাড়া বৃষ্টির মৌসুমে অতিরিক্ত পানি থাকলে সংগ্রহে সমস্যা হয়। কৃষকরা চান, সরকারী সহায়তায় টেপাপোনা সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা হোক, যাতে বছরের অন্য সময়েও তারা এটি বিক্রি করতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইশরাতুন্নেচ্ছা এশা বলেন, প্রাকৃতিক সার হিসেবে টেপাপোনার ব্যবহার বাড়ালে রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে কৃষি হবে টেকসই, পরিবেশও থাকবে সুরক্ষিত।
নাজিরপুরের এই কৃষকরা প্রমাণ করেছেন যে উপাদান একসময় অবহেলিত ছিল, সেটিই এখন জীবিকার অন্যতম উৎস হয়ে উঠতে পারে। জলাভূমির এই সবুজ সোনা আজ বদলে দিচ্ছে গ্রামের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনধারা।



