― Advertisement ―

ভেনেজুয়েলায় ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্প; নিহত ৩২, আহত ৭০০ এবং ১ লাখ মানুষের প্রাণহানির বৈশ্বিক শঙ্কা

ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের অঞ্চলে বুধবার (২৪ জুন, ২০২৬) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টার পর মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, প্রথম কম্পনটি ৭.২ মাত্রায় কারাকাস থেকে ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপেতে এবং দ্বিতীয় কম্পনটি ৭.৫ মাত্রায় ইউমারের কাছে অনুভূত হয়। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন ও ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে প্রাথমিকভাবে ৩২ জনের মৃত্যু এবং ৭০০ জনের আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে ইউএসজিএস-এর গ্লোবাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট মডেল সতর্ক করেছে যে, এই দুর্যোগের সুদূরপ্রসারী প্রভাবে শেষ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা ১০ হাজার থেকে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঠিক পূর্বমুহূর্তে কারাকাসের লস পালোস গ্রান্দেস এলাকায় সপরিবারে অবস্থান করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিবিসি (BBC) সাংবাদিক ভ্যালেন্তিনা ওরোপেজার মা ও বোন ভেরোনিকা। সন্ধ্যা নামার পরপরই ভেরোনিকার কাছ থেকে ভ্যালেন্তিনার হোয়াটসঅ্যাপে একটি আতঙ্কিত অডিও বার্তা আসে, যেখানে ব্যাকগ্রাউন্ডে বাড়িঘর ভয়ংকরভাবে কাঁপার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছিল। এর পরেই কারাকাসের স্থানীয় ইন্টারনেট ও যোগাযোগ অবকাঠামো সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় পরবর্তী দীর্ঘ দুই ঘণ্টা মা ও বোনের সাথে সমস্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ভ্যালেন্তিনার। দূরদেশ থেকে চ্যাট গ্রুপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ধুলোয় মিশে যাওয়া শহরের ছবি এবং ভিডিও দেখে এক চরম মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সময় কাটে এই আন্তর্জাতিক সাংবাদিকের।

বিশেষ করে লস পালোস গ্রান্দেস এলাকার একটি বহুতল ভবন বিস্কুটের মতো ভেঙে টুকরা টুকরা হয়ে ধসে পড়ার একটি ভিডিও দেখে ভ্যালেন্তিনা স্তব্ধ হয়ে যান, কারণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সেই ভবনটি ছিল তাঁর মায়ের বাসস্থান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে। দীর্ঘ দুই ঘণ্টার অবরুদ্ধতা ও বিভীষিকা কাটিয়ে যখন কারাকাসের ইন্টারনেট সংযোগ আংশিক পুনরুদ্ধার হয়, তখন বোন ভেরোনিকা কোনোমতে কল করে ভ্যালেন্তিনাকে শুধু বলতে পেরেছিলেন—‘বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি।’ আতঙ্ক আর কান্নায় ভেঙে পড়া সেই সংক্ষিপ্ত সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগে ভ্যালেন্তিনা কেবল এটুকু নিশ্চিত হতে পারেন যে, লাখো মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কার মাঝেও অলৌকিকভাবে তাঁর মা ও বোন ধ্বংসস্তূপের বাইরে বেঁচে আছেন।

বর্তমানে কারাকাসসহ ভেনেজুয়েলার প্রধান শহরগুলোতে ব্যাপক উদ্ধার তৎপরতা চালাচ্ছেন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা, যেখানে ধসে পড়া ভবনের রড ও সিমেন্টের চাঁই কেটে জীবিত ও মৃতদের বের করে আনা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। জোড়া ভূমিকম্পের পরপরই ক্যারিবীয় অঞ্চলে সাময়িক সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করে নেয় কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে কারাকাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সারা দেশে সমস্ত বিদ্যালয় ও রেলসেবা স্থগিত রাখা হয়েছে। ভূমিকম্পের কম্পন থামলেও ভেনেজুয়েলার কোটি মানুষের মন থেকে চরম আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।