এক বিধবা নারীকে একাধিকবার ধর্ষণ ও জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার গুরুতর অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জিসান মিয়া প্রধান বর্তমানে পুলিশের কঠোর পাহারায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তবে হাসপাতালের সব ধরণের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় জিসান সম্পূর্ণ ‘সুস্থ’ প্রমাণিত হলেও তিনি নিজেকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘অসুস্থ’ দেখিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আইনি ভাষায় জিসানের এই আচরণকে গ্রেপ্তার এড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘চিকিৎসাগত আত্মগোপন’ (Medical Evading) হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এই জটিল পরিস্থিতির কারণে পুলিশ এখনো তাঁকে আদালতে হাজির করতে পারছে না, যা বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাময়িক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে।
পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, ভুক্তভোগী ওই নারীর সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয়ের পর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন জিসান। একপর্যায়ে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে জিসান তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে গর্ভপাত ঘটান। পরবর্তীতে ওই নারী বিয়ের জন্য চাপ দিলে ১২ জুন (২০২৬) বিয়ের দিন ধার্য করা হয়। তবে বিয়ে এড়াতে ১১ জুন রাতে জিসান নিজেই নিখোঁজ হওয়ার একটি ছদ্ম-অপহরণের নাটক সাজান, যার ভিত্তিতে তাঁর পরিবার থানায় সাধারণ ডায়েরি (GD) করে। পরবর্তীতে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (DB) অনুসন্ধান চালিয়ে গত শুক্রবার রাতে লাকসাম রেলওয়ে জংশন এলাকা থেকে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসে। হাসপাতালে আসার শুরুতে জিসান স্বাভাবিক আচরণ করলেও ধর্ষণের মামলায় গ্রেপ্তারের খবর শোনার পর থেকেই তিনি সম্পূর্ণ ‘নিশ্চল’ হয়ে চোখ খোলা বন্ধ করে দিয়েছেন।
এই নাটকীয় অসুস্থতার সত্যতা ও জিসানের শারীরিক বাস্তব অবস্থা নিরূপণের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চার সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠন করেছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান জানিয়েছেন, মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের নেতৃত্বে গঠিত এই বোর্ডে অ্যানেসথেসিয়া, নিউরো মেডিসিন ও মনোরোগবিদ্যা বিভাগের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আগামীকাল সোমবার (১৫ জুন) বেলা ১১টায় এই বোর্ড জিসানের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। তিনি যদি চিকিৎসাগতভাবে সুস্থ প্রমাণিত হন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (Discharge) দিয়ে তাঁকে পুলিশি হেফাজতে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হবে। ইতোমধ্যে ভুক্তভোগী নারীর আইনি স্বাস্থ্য পরীক্ষাও সম্পন্ন হয়েছে।
দাউদকান্দি মডেল থানা পুলিশ জানায়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ওই ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে জিসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার অপর তিন আসামি—সেকান্দর আলী, গোলাম রাব্বী ও সজীব হাসানকে ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার করে গত শনিবার আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এদিকে জিসানের নৈতিক স্খলনজনিত এই ফৌজদারি অপরাধের দায়ে ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের দলীয় শৃঙ্খলা নীতি অনুযায়ী জিসান মিয়া প্রধানকে সংগঠন থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দাউদকান্দি মডেল থানা এবং জেলা ডিবির ওসি শামসুল আলম শাহ নিশ্চিত করেছেন যে, জিসানের জবানবন্দি গ্রহণ ও রিমান্ড আবেদনের আইনি প্রক্রিয়া মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে।



