নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান অস্থিরতা ও গ্রাহকদের অস্বাভাবিক আমানত উত্তোলনের চাপে তীব্র তারল্য সংকটের মুখে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং ব্যাংকটির তারল্য কাঠামো সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ আর্থিক সহায়তা চাওয়া হয়েছে। গতকাল সোমবার (৮ জুন) দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ সংক্রান্ত একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিয়েছে। ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঈদুল আজহার ছুটির পর গত পাঁচ কার্যদিবসে জমার তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত উত্তোলন করেছেন গ্রাহকরা, যা সাধারণ সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি।
অতিরিক্ত নগদ উত্তোলনের এই প্রবাহ ব্যাংকটিকে আবারও বিধিবদ্ধ নগদ সংরক্ষণ (সিআরআর) বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলেছে। ব্যাংকটির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ইসলামী ব্যাংকের চলতি হিসাবে গত কয়েক দিন আগেও ৭ হাজার ১৫ কোটি টাকার বেশি ব্যালেন্স ছিল। তবে সাম্প্রতিক উত্তোলনের জোয়ারে তা কমে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। গ্রাহকদের চাহিদা নির্বিঘ্নে পূরণ এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সিআরআর ঘাটতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এই বিপুল অঙ্কের তারল্য সহায়তা চেয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
ব্যাংকটির এই আকস্মিক আর্থিক সংকটের মূলে রয়েছে শীর্ষ নেতৃত্বে রদবদল নিয়ে সৃষ্ট তীব্র অসন্তোষ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর থেকেই ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে একটি পক্ষ আন্দোলন শুরু করে। গত ১ জুন থেকে চলা এই কর্মসূচিতে খুরশীদ আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি জানানো হচ্ছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এছাড়া ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিক্ষোভের মুখে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সাল থেকে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং এস আলম গ্রুপের প্রভাবমুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। সম্প্রতি চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে পরিবর্তন আসার পর আবারও ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারী ও গ্রাহকদের আস্থা বজায় রাখাই এখন ব্যাংকটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই ১০ হাজার কোটি টাকার আবেদনের প্রেক্ষিতে কী সিদ্ধান্ত নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ইসলামী ব্যাংকের আগামী কয়েক দিনের আর্থিক স্থিতিশীলতা।



