― Advertisement ―

কোটাবিরোধী আন্দোলন: সড়ক অবরোধ করে বিএম কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল: সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে বরিশাল সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার (৯...

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সংকটে বরিশালে পরিবেশ

বরিশাল প্রতিনিধি

বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে। একটি প্রধান সমস্যা হলো পানির স্তর হ্রাস এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ। বিশেষত সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় লবণাক্ত পানির প্রবেশ বেড়ে যাওয়ায় মিঠা পানির উৎসগুলো দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। এই সংকটের কারণে সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।

স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, পানির স্তরের হ্রাসের অন্যতম কারণ হলো সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি, যা বিশ্বব্যাপী গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সরাসরি প্রভাব। বরিশালের কিছু নিম্নাঞ্চল সমুদ্রের কাছাকাছি হওয়ায়, সেখানে লবণাক্ত পানি মাটির নিচে ঢুকে যাচ্ছে, ফলে কৃষিক্ষেত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে বরিশালের কৃষিক্ষেত্রে। লবণাক্ততার কারণে ফসল উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। বিশেষত ধান, সরিষা এবং সবজি চাষীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। মাটিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অনেক ফসলের বীজ অঙ্কুরিত হতে পারছে না, আবার যেগুলো হচ্ছে সেগুলো খুবই দুর্বল।

স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করছেন, সঠিক সময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়ার কারণে সেচের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। তবে পানির অভাবে ও মাটির লবণাক্ততার কারণে সেচ ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।

রোদের তীব্রতা বৃদ্ধিতে ফসলের ক্ষতি পাশাপাশি, বরিশালে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং রোদের তীব্রতা অনেক বেড়েছে, যার ফলে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ফসলের পাতা পোড়াতে শুরু করেছে, মাটি শুষ্ক হয়ে যাচ্ছে, যা ফসলের বৃদ্ধিতে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩৮-৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করছে, যা ফসলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

বরিশালের সাধারণ মানুষ এই সংকটের কারণে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। বরিশাল চরমোনাই ইউনিয়নের স্থানীয় এক কৃষক বেল্লাল হোসেন বলেন,আমাদের জমিতে যে পরিমাণ ফসল হতো, এখন তার অর্ধেকও হচ্ছে না। লবণাক্ত পানি এবং অতিরিক্ত রোদের কারণে সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা জসিম উদ্দিন জানান,পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়, এমনকি সেখানেও লবণাক্ততা থাকে। আমাদের বাচ্চারা পানি থেকে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বরিশালের নদ-নদীগুলোও বিপর্যস্ত। শিল্প-কারখানার দূষণ এবং প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় নদীর পানি মারাত্মক দূষণের সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে মাছের প্রজাতি হ্রাস পাচ্ছে এবং অনেক নদীপ্রধান জীব বৈচিত্র্য বিলুপ্তির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ নদীর পানিতে মিশে জনস্বাস্থ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বরিশালে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফসলের ক্ষতি ছাড়াও জনস্বাস্থ্য সংকটে পড়ছে। লবণাক্ত পানি এবং দূষিত পানির কারণে বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে, যেমন ডায়রিয়া, টাইফয়েড, এবং ত্বকের রোগ। স্থানীয় হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। এছাড়া, বাতাসে অতিরিক্ত ধূলিকণা এবং বায়ু দূষণের কারণে শ্বাসকষ্টজনিত রোগের পরিমাণ বেড়েছে। শিশু এবং বৃদ্ধরা এই রোগের শিকার বেশি হচ্ছেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট লিংকন বায়েন জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বরিশালসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি, পানির স্তরের হ্রাস এবং লবণাক্ততার বিস্তার দেখা যাচ্ছে, যা কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সুপেয় পানির অভাব এবং নদী দূষণের কারণে মানুষের জীবনযাত্রা কষ্টকর হয়ে উঠছে।

তিনি জানান, আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, লবণ সহনশীল ফসলের চাষ, নদী পুনঃখনন, এবং পানি সংরক্ষণের উদ্যোগ জোরদার করা হোক। পরিবেশ সুরক্ষা ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে স্থানীয় জনগণকে সচেতন করতে সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।

বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন,জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বরিশালে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। লবণাক্ততার বৃদ্ধি, পানির স্তরের হ্রাস এবং ফসলের ক্ষতি আমাদের কৃষি ও জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। সরকার ইতিমধ্যে এ সমস্যা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যার মধ্যে নদী পুনর্খনন, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন, এবং লবণ সহনশীল ফসলের চাষ উল্লেখযোগ্য। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই সমাধান প্রয়োজন। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও পুনঃব্যবহারের ব্যবস্থা, লবণ সহনশীল ফসলের চাষ, এবং বায়ু দূষণ কমানোর উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এ ছাড়া, স্থানীয় মানুষকে সচেতন করে তোলা এবং সরকার ও এনজিওগুলোর সমন্বয়ে কাজ করা জরুরি।

বরিশাল অঞ্চলের এই সংকট জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে, নতুবা ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের কৃষি, অর্থনীতি এবং জনস্বাস্থ্য আরও বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।