পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিধ্বংসী ইরান যুদ্ধের আশঙ্কা এবং লোহিত সাগর থেকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া চরম ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আজ সোমবার (২৫ মে, ২০২৬) চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘সিনহুয়া’ এই স্ট্র্যাটেজিক বৈঠকের তথ্যটি বিশ্ব গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক আধিপত্যের বিপরীতে এশীয় পরাশক্তি চীন ও তাদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মিত্র পাকিস্তানের এই বৈঠকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটি এমন এক জটিল ও সংবেদনশীল সময়ে অনুষ্ঠিত হলো, যখন পাকিস্তান ও চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি দেশ পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের আঞ্চলিক বিস্তার ঠেকাতে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকরে পর্দার আড়ালে তীব্র কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যদি কোনো বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তা এশিয়ার অর্থনীতি এবং চীনের বিলিয়ন ডলারের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) ও পাকিস্তান-চীন অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) প্রকল্পের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই সাধারণ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার্থেই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এক টেবিলে বসেছেন।
বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এই মূল বৈঠকের ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গেও এক পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নেন। উল্লেখ্য, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (CCP) পলিটব্যুরোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য লি চিয়াংকে দেশটির প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীনের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধান—উভয় শীর্ষ নেতার সাথে একই দিনে শাহবাজ শরিফের এই ম্যারাথন বৈঠক প্রমাণ করে যে, বেইজিং ও ইসলামাবাদের মধ্যকার চিরাচরিত ‘অল-ওয়েদার ফ্রেন্ডশিপ’ বা চিরস্থায়ী বন্ধুত্ব বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে নতুন গতি পেয়েছে।
যদিও এই কূটনৈতিক আলোচনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সংবলিত আনুষ্ঠানিক যৌথ বিবৃতি এখনো বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি, তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরান-ইসরায়েল সংকটের সম্ভাব্য প্রভাব, পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা (বিশেষ করে চীনা নাগরিকদের সুরক্ষা), অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদারের বিষয়ে নিবিড় আলোচনা হয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বেইজিং এই সংকটের সময়ে ইরান ও পাকিস্তানের মধ্যকার সীমান্ত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছে এবং পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিরসনে একটি সুনির্দিষ্ট শান্তি ফর্মুলা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ঐক্যমত তৈরি হয়েছে।



