প্রতি বর্ষা মৌসুম এলেই শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার মানুষের দুর্ভোগ যেন নতুন করে শুরু হয়। ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে মহারশী নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে নদীভাঙন ও বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে প্লাবিত হয় ঝিনাইগাতী বাজারসহ আশপাশের নিচু এলাকা, ক্ষতিগ্রস্ত হন নদীর দুই তীরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা।
প্রতি বছর নদীভাঙনে বসতভিটা, কৃষিজমি, সড়ক, বাজার ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার হারাচ্ছে তাদের ঘরবাড়ি ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর নাব্যতা সংকট, পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এবং টেকসই বাঁধের অভাবের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও ভয়াবহ হচ্ছে। গত এক দশকে মহারশী নদীর ভাঙনে অন্তত ৫০০টি পরিবার তাদের বসতভিটা হারিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসী নদী পুনঃখনন, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ এবং কার্যকর পানি ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়ে আসছেন।
ভারতের মেঘালয়ের পশ্চিম ও দক্ষিণ গারো পাহাড় থেকে উৎপন্ন মহারশী নদী ঝিনাইগাতীর গারোকোনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পরে মালিঝি নদীতে মিলিত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭ কিলোমিটার এবং গড় প্রস্থ ৫৭ মিটার।
ভাঙনের ইতিহাস
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রতি বর্ষায় নলকুড়া ও ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়নের প্রায় ১০টি স্থানে নদীভাঙন দেখা দেয়।
২০২৪ সালের অক্টোবর এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মহারশী নদীর দুই তীরের বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এতে বসতবাড়ি, কৃষিজমি, পুকুর, বাজার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর স্থানীয় সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবিতে গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, স্মারকলিপি প্রদান এবং বিভিন্ন আলোচনা সভার আয়োজন করে।
৪৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, মহারশী নদীর দুই তীরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার, পুনর্বাসন এবং নদী পুনঃখননের জন্য ৪৮ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২৪ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও পুনর্বাসনে ২২ কোটি ২৯ লাখ টাকা এবং ১৭ কিলোমিটার নদী পুনঃখননে ২৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি পাউবোর একটি কারিগরি দল ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করলেও এখনো প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
ভুক্তভোগীদের আহাজারি
খাইলকুড়া এলাকার ব্যবসায়ী মো. বিনামিন জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবরে নদীভাঙনে তার বাড়ি ও মুরগির খামার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়।
তিনি বলেন, “চোখের সামনে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবকিছু নদীতে তলিয়ে যায়। প্রায় ৩০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পুঁজি না থাকায় এখনো ব্যবসা শুরু করতে পারিনি।”
ঝিনাইগাতী সদর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. জাহিদুল হক মনির বলেন, প্রায় প্রতিবছরই বাঁধ ভেঙে ঝিনাইগাতী সদর বাজার ও আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ ও নদী পুনঃখননের বিকল্প নেই।
যা বলছেন কর্মকর্তারা
শেরপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) সুদীপ্ত চৌধুরী জানান, নদীর বাঁধ সংস্কার ও পুনঃখননের নকশা তৈরির কাজ চলছে। নকশা সম্পন্ন হলে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হবে। একনেকের অনুমোদন পেলেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা সম্ভব হবে।
শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল জানান, তিনি একাধিকবার জাতীয় সংসদে বিষয়টি তুলে ধরেছেন এবং দ্রুত প্রকল্প অনুমোদনের আশা করছেন।
এদিকে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেন গত ২৮ জুলাই ঝিনাইগাতীতে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করে জানান, পানি সম্পদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ এবং স্থানীয় সরকার—এই তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত উদ্যোগে মহারশী নদীর বন্যা ও ভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা হবে।
সূত্র: ইউএনবি (UNB)



