পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ১৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার (১৭৫ মিলিয়ন ডলার) সহজ শর্তের ঋণ অনুমোদন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। আজ মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ফিলিপাইনের ম্যানিলায় এডিবির সদর দফতরে আয়োজিত পর্ষদ সভায় এই ঋণ মঞ্জুর করা হয়। ‘সাসটেইনেবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কমিউনিটি এমপাওয়ারমেন্ট ইন দ্য পার্বত্য চট্টগ্রাম ট্রাক্টস’ শীর্ষক এই প্রকল্প দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্পের আওতায় খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলার ২৬টি দুর্গম উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ নেটওয়ার্কের ব্যাপক সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন সম্পন্ন করা হবে। এর ফলে পাহাড়ি এলাকার অন্তত ৮৮ হাজার নতুন পরিবার সরাসরি বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আসবে, যার মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অন্তত ৩৫ হাজার পরিবার রয়েছে।
প্রকল্পের মূল অবকাঠামোগত কাজের অংশ হিসেবে ৮০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ধারণক্ষমতাসম্পন্ন নতুন ছয়টি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন নির্মাণ করা হবে। একই সাথে সিস্টেম লস কমানো প্রযুক্তির পরিবাহী ব্যবহার করে ৫,০৩২ কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন তৈরি এবং ১,৮৭৪ কিলোমিটার পুরোনো জরাজীর্ণ বিতরণ লাইন, চারটি সাবস্টেশন, একটি সুইচিং স্টেশন ও একটি আঞ্চলিক মেরামত কর্মশালা সংস্কার করা হবে। এতে করে গ্রিডের সার্বিক কার্যক্ষমতা বাড়বে এবং বছরে অন্তত ১৯,৩০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমপরিমাণ নির্গমন হ্রাস পাবে।
বাংলাদেশে এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর কিংশেন ঝাং বলেন, “নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ সুবিধা পাহাড়ের দুর্গম জনগোষ্ঠীকে নিরাপদ শক্তির সাথে যুক্ত করবে। এটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, নারী ক্ষমতায়ন ও জীবনমানের স্থায়ী পরিবর্তন ত্বরান্বিত করবে।”
প্রায় ১৮ লাখ ৪০ হাজার জনগোষ্ঠীর বসবাস এই তিন পার্বত্য জেলায়, যার অর্ধেকেরও বেশি বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্য। দেশে সার্বিক বিদ্যুৎ সুবিধা ৯৯ শতাংশে পৌঁছালেও পার্বত্য চট্টগ্রামে তা অনেক কম; বর্তমানে খাগড়াছড়িতে ৪৯, রাঙামাটিতে ৪৩ ও বান্দরবানে মাত্র ৪১ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছেন। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ২০৩২ সালের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের গ্রিড কভারেজ ৬৮ শতাংশে উন্নীত করা এবং ভবিষ্যতে সৌর ও ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলা।
অবকাঠামোর পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে ৩টি পার্বত্য জেলায় অন্তত ৩০টি সৌরচালিত সুপেয় পানি সরবরাহকেন্দ্র স্থাপন করা হবে, যেখানে পরিচালনা কমিটির নেতৃত্বের অন্তত ৩০ শতাংশ পদে থাকবেন নারীরা। একই সাথে স্কুল, হাসপাতাল, উপাসনালয় ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ব্যবহৃত অন্তত ২০টি জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে সোলার ব্যাকআপ সিস্টেম বসানো হবে।
স্থানীয় অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ১,০০০ জন অধিবাসীকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, ২০০ জনের বেশি উদ্যোক্তাকে ব্যবসা শুরুর সহায়তা এবং ৩০০ শিক্ষার্থীকে বিদ্যুৎ খাতভিত্তিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে। তিন জেলায় তিনটি অভিযোগ কেন্দ্র ও ডিজিটাল মনিটরিং সুবিধাসহ তিনটি শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু করবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। এই প্রকল্পে এডিবির ঋণের বাইরে জাপান সরকার ‘জাপান ফান্ড ফর প্রসপারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ (জেএফপিআর)-এর আওতায় ২৭ লাখ ২০ হাজার ডলার অনুদান দিচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার ৩৬.৫৪ মিলিয়ন ডলার এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা বিপিডিবি ৪৫.৬৫ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে।



