― Advertisement ―

ইরানে মার্কিন বিমান হামলা: বন্দর আব্বাসে ইতিহাসের প্রথম ‘সি-ড্রোন’ ও শোধনাগারে বোমাবর্ষণ

উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার সামরিক সংঘাত এক নজিরবিহীন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কৌশলগত খুজেস্তান প্রদেশের দুটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ শহর—মাহশহর ও আবাদানে ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। খুজেস্তান প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর ভালিওল্লাহ হায়াতির বরাত দিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ‘ইরনা’ এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। আবাদান শহরটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম তেল শোধনাগার অঞ্চলের সুরক্ষাবলয় হিসেবে পরিচিত হওয়ায় এই হামলা তেল বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি করেছে।

স্থানীয় সুনির্দিষ্ট সামরিক সূত্রের তথ্য অনুসারে, মঙ্গলবার দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে আবাদানে প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ঠিক এর পাঁচ মিনিট পর, দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে নিকটবর্তী বন্দরনগরী মাহশহরের কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে নিশানা করে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায় মার্কিন যুদ্ধবিমান। ইরাক ও কুয়েত সীমান্তের অতি নিকটবর্তী এই পুরো অববাহিকায় বিগত কয়েক দিন ধরে মার্কিন জোট ও ইরানি বাহিনীর মধ্যে চলমান সীমান্ত সংঘর্ষের ধারাবাহিকতায় এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। তবে এই আকস্মিক ও শক্তিশালী বোমাবর্ষণে ঠিক কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি ঘটেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি তেহরান প্রশাসন।

এই বিমান হামলার ঠিক আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক ঐতিহাসিক ও যুদ্ধকৌশলগত ঘোষণা দেয়। সেন্টকম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানায়, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো তারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মনুষ্যবিহীন সি-ড্রোন (চালকবিহীন নৌযান) ব্যবহার করে ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর বিশেষ প্রযুক্তিতে তৈরি ‘কোরসেয়ার’ মডেলের তিনটি একমুখী আত্মঘাতী ড্রোন বন্দর আব্বাস নৌঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে বলে ওয়াশিংটন দাবি করেছে।

মার্কিন সামরিক নীতিনির্ধারকদের দাবি, আত্মঘাতী ড্রোনের এই অতর্কিত হামলা আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় বাণিজ্যিক পণ্যবাহী জাহাজের ওপর নিয়মিত আঘাত হানার ক্ষেত্রে ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে বহুলাংশে পঙ্গু করে দেবে। সেন্টকম হামলার সপক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ করলেও সামরিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই রোবোটিক সামরিক পদক্ষেপ পারস্য উপসাগরের সার্বিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের গতিপথকে এক গভীর দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিল।

অন্যদিকে, ভূকৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক কার্গো ও অয়েল ট্যাংকারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিনিময়ে ২০ শতাংশ অর্থ বা মাশুল আদায়ের মার্কিন পরিকল্পনার কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরান স্পষ্ট ও দৃঢ় ভাষায় ঘোষণা করেছে, এই অতি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথের প্রধান পাহারাদার হিসেবে ইরান অতীতেও দায়িত্ব পালন করেছে, বর্তমানেও করছে এবং ভবিষ্যতেও চিরকাল অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে থাকবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বার্তায় ট্রাম্পের প্রস্তাবের ওপর তীব্র কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নিয়েছেন যে সুরক্ষাদাতাকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া যুক্তিসঙ্গত। আর ইরান যেহেতু যুগ যুগ ধরে হরমুজ প্রণালির রক্ষক, তাই এই মাশুল পাওয়ার একক দাবিদার তেহরানই। তবে আরাগচি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ২০ শতাংশ ফি-কে ‘অতিরিক্ত’ আখ্যায়িত করে বলেন, ইরান মাশুল নির্ধারণে সম্পূর্ণ ন্যায্য ও বৈশ্বিক নিয়ম মেনে চলবে।

এই বাকযুদ্ধ চরম আকার ধারণ করে মূলত ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া ট্রাম্পের এক চরম বিবৃতির পর। ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, ওয়াশিংটন ইরানের ওপর আবারও কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করতে যাচ্ছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা খরচের দোহাই দিয়ে চলাচলকারী সমস্ত কার্গো জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ ‘নিরাপত্তা ফি’ জোরপূর্বক আদায় করা হবে। ট্রাম্পের দাবি ছিল, ইরান এই সিদ্ধান্তে সহযোগিতা না করলেও প্রণালির নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতেই থাকবে, যা ইরানের সার্বভৌমত্বে বড় ধরনের আঘাত।

মার্কিন প্রশাসনের এই ২০ শতাংশ মাশুল আদায়ের বিতর্কিত উদ্যোগের তীব্র ও কূটনৈতিক সমালোচনা করেছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা। সাও পাওলোর এক গণসমাবেশে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনাকে সরাসরি ‘জলদস্যুতা’র সাথে তুলনা করেছেন। লুলা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের জলসীমায় চলাচলকারী জাহাজ থেকে এভাবে অর্থ আদায় করে, তবে আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে তারা একটি ‘জলদস্যু রাষ্ট্রে’ পরিণত হবে। একটি বৈশ্বিক পরাশক্তির কাছ থেকে এমন দস্যুতামূলক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

ব্রাজিলীয় রাষ্ট্রপ্রধানের মতে, চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি আক্রমণের পর ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালি বন্ধ এবং পরবর্তীতে যুদ্ধবিরতির পর আবার এই নতুন সংকট ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারকে ধ্বংস করছে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ প্রভাবে ব্রাজিলে চাল, ডাল, পেঁয়াজ ও টমেটোর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে। ৮০ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ বামপন্থী নেতা জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানির বিশেষ শুল্ক মওকুফসহ একাধিক জরুরি জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।