মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে। রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের জন্য দিনভর অপেক্ষা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালক ও নিম্ন আয়ের পেশাজীবীদের ভোগান্তি চরমে। বুধবার আসাদ গেট ও তেজগাঁওয়ের ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, তেলের জন্য যানবাহনের সারি এক কিলোমিটার ছাড়িয়ে গেছে। তেলের দাম বাড়লেও মানুষের মূল সংকট এখন সময় নিয়ে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় দিনমজুর ও রাইডারদের দৈনিক আয় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
তেজগাঁওয়ের একটি ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষমাণ রাইডার সাইফুল ইসলামের জীবনসংগ্রামের চিত্রটি অত্যন্ত করুণ। দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়েও তিনি তেল পাননি। পেটের দায়ে রোদে পুড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তিনি খাবারের বিরতি নিতে পারছেন না, কারণ একবার লাইনচ্যুত হলে জ্বালানি পাওয়ার শেষ আশাটুকুও হারাবেন। সাইফুলের মতো হাজারো রাইডার ও চালকের কাছে এখন ‘খাওয়ার চেয়ে জ্বালানি পাওয়া’ বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। তেলের সংকটে কেবল ইঞ্জিন নয়, যেন থমকে গেছে তাদের সংসারের চাকাও। তেলের দাম বৃদ্ধিতে তাদের অভিযোগ না থাকলেও, তেল পাওয়ার অনিশ্চয়তা তাদের কর্মঘণ্টা কেড়ে নিচ্ছে।
সরকারিভাবে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত বলে দাবি করা হলেও সাধারণ মানুষের মাঝে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কজনিত ক্রয়ের প্রবণতা কমছে না। ১৯ এপ্রিল তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার আশা করেছিল পরিস্থিতির উন্নতি হবে, কিন্তু বাস্তবে লাইনের দৈর্ঘ্য কমেনি। তেজগাঁও ও নিকুঞ্জ এলাকায় ব্যক্তিগত গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স ও ছোট পিকআপ ভ্যানের দীর্ঘ সারি জনজীবনের অস্থিরতারই ইঙ্গিত দেয়। অনেক ফিলিং স্টেশনে বিকেলের আগেই তেল ফুরিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যা মানুষের মনে আরও বেশি দুশ্চিন্তা ও সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে কিছু ফিলিং স্টেশন রেশনিং না করার দাবি করলেও, জ্বালানি প্রাপ্তির লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। গাজীপুরের টঙ্গী থেকে আসা স্যানিটারি মিস্ত্রি সুমনের মতো কর্মজীবীদের তেলের জন্য এখন ‘ফুয়েল পাস’ তৈরির চিন্তা করতে হচ্ছে। যাদের এই পাস নেই, তাদের জ্বালানি প্রাপ্তিতে আরও বেশি বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। যতক্ষণ পর্যন্ত বিশ্ববাজার এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থা স্থিতিশীল না হবে, ততক্ষণ রাজধানীর এই জ্বালানি যুদ্ধ ও দীর্ঘ অপেক্ষার দৃশ্যপট পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।



