ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় এক ভয়াবহ বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। সোমবার (২০ এপ্রিল ২০২৬) দুপুর থেকে উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে সাতটি ইউনিয়ন পুরোপুরি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। আশুগঞ্জ থেকে আসা উচ্চ ভোল্টেজের সঞ্চালন লাইনে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দেওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় কয়েক হাজার গ্রাহক চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, বিশেষ করে রমজান ও গরমের এই সময়ে জনজীবন ও ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, সরাইল উপজেলার সদরসহ গুরুত্বপূর্ণ সাতটি ইউনিয়ন পিডিবির বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের আওতাধীন। আশুগঞ্জ থেকে আসা ৩৩ কেভি (কিলোভোল্ট) বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনে সোমবার দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। এরপর থেকেই সরাইল সদর, কালীকচ্ছ, চুন্টা, নোয়াগাঁও, শাহবাজপুর, শাহজাদাপুর ও পানিশ্বর ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাহক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরেজমিনে সরাইলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যা নামার পর থেকেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। অনেক ব্যবসায়ী দোকানে মোমবাতি জ্বালিয়ে কোনোমতে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন। ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন এবং পানির পাম্প চালাতে না পেরে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ভ্যাপসা গরমের মধ্যে দীর্ঘক্ষণ বিদ্যুৎ না থাকা মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিচ্ছে।
এর আগে গত শনিবারও সরাইলে ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড় ও শিলাবৃষ্টির কারণে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ ছিল না। সেবার দুপুর থেকে রাত দেড়টা পর্যন্ত পুরো উপজেলা বিদ্যুৎহীন ছিল। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও সঞ্চালন লাইনের ত্রুটি উপজেলাবাসীকে নতুন সংকটে ফেলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরাইলে লোডশেডিং এখন নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর একবার বিদ্যুৎ গেলে তা আসার কোনো নির্দিষ্ট সময় থাকে না।
শাহজাদাপুর গ্রামের বাসিন্দা ভরত দাশ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের এখানে একবার বিদ্যুৎ গেলে দুই-এক দিন পরেও আসে না। অভিযোগ দিলেও কোনো কাজ হয় না। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে বাসাবাড়ির ফ্রিজ, টিভি ও ফ্যানসহ দামী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।” ভুক্তভোগীদের দাবি, পিডিবির গাফিলতি ও পুরোনো সঞ্চালন লাইনের কারণেই এমন বিপর্যয় বারবার ঘটছে।
গরমের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়েছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরবরাহ ও সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা বৃদ্ধি না পাওয়ায় ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়াসা ও স্থানীয় পাম্পগুলো পানি তুলতে পারছে না, ফলে অনেক এলাকায় খাওয়ার পানিরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হাসপাতালের সেবা এবং ইফতার ও সাহরির সময় বিদ্যুৎ না থাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
পিডিবির সরাইল কার্যালয় জানিয়েছে, এবারের ত্রুটিটি বেশ বড় ধরনের। আশুগঞ্জে অবস্থিত সঞ্চালন লাইনের এই সমস্যা সমাধানের জন্য স্থানীয় কারিগরি টিম যথেষ্ট নয়। তাই কুমিল্লা থেকে বিশেষ টেকনিশিয়ান ও প্রকৌশলীদের তলব করা হয়েছে। তারা রওনা হয়েছেন এবং রাত আটটার মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এরপর মেরামতের কাজ শুরু হলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক ঘণ্টা লাগতে পারে।
সরাইলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও বর্তমানে এখানে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ ঘটেছে। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে কলকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফ্রিজিং পণ্যের দোকানদাররা জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের সংরক্ষিত অনেক মালামাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে। মোমবাতি জ্বালিয়ে দোকান খোলা রাখলেও কাস্টমাররা গরমের কারণে বাজারে আসতে চাচ্ছেন না।
নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, “আশুগঞ্জের ৩৩ কেভি সঞ্চালন লাইনে বড় ধরনের ত্রুটি দেখা দিয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করেছি। বিশেষজ্ঞ টিম আসার পর কাজ শুরু হবে।” তিনি আরও জানান, সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়া পর্যন্ত বিকল্প কোনো উপায়ে সরাইলে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিশেষে বলা যায়, সরাইলের এই বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন না হলে বড় ধরনের নাগরিক অসন্তোষের সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করেছেন, কেবল সাময়িক মেরামত নয়, বরং পুরোনো ৩৩ কেভি লাইন সংস্কার করে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের উচিত দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখা, যাতে সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্ধকারে কাটাতে না হয়।



