দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আট দশকের দীর্ঘ ঐতিহ্য ভেঙে এক যুগান্তকারী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাপান। দেশটির সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র রপ্তানির ওপর আরোপিত দীর্ঘদিনের কঠোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার অনুমোদন দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি-র মন্ত্রিসভা এই সংক্রান্ত নতুন নির্দেশিকা অনুমোদন করার মাধ্যমে জাপানের শান্তিবাদী (Pacifist) পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করল। এই সিদ্ধান্তের ফলে জাপানি সামরিক প্রযুক্তি ও অস্ত্র এখন বিশ্ববাজারে বিক্রির জন্য উন্মুক্ত হলো।
জাপানের এই পদক্ষেপকে আধুনিক বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান যে শান্তিবাদী সংবিধান গ্রহণ করেছিল, তার অন্যতম স্তম্ভ ছিল অস্ত্র রপ্তানি না করা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং বিশেষ করে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক প্রভাবের মুখে টোকিও তার নীতি পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছে।
নতুন নীতিমালার ফলে জাপান এখন কেবল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নয়, বরং সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে ব্যবহৃত ‘প্রাণঘাতী’ বা মারণাস্ত্র বিদেশে রপ্তানি করতে পারবে। এর আগে জাপান কেবল লাইসেন্সের অধীনে তৈরি করা যন্ত্রাংশ বা অ-প্রাণঘাতী সরঞ্জাম রপ্তানির অনুমতি দিত। কিন্তু এখন থেকে জাপানি প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন, মিসাইল এবং অন্যান্য আধুনিক যুদ্ধাস্ত্র আন্তর্জাতিক মিত্রদের কাছে বিক্রির পথ প্রশস্ত হলো।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে জাপানের দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যও রয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে কেবল জাপানি আত্মরক্ষা বাহিনীর (JSDF) জন্য অস্ত্র তৈরি করায় দেশটির প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলো বিশ্ববাজার থেকে পিছিয়ে ছিল। এখন রপ্তানির সুযোগ তৈরি হওয়ায় মিতসুবিশি বা কাওয়াসাকির মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন সক্ষমতা এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
জাপান সরকার মনে করছে, আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা অংশীদারদের সঙ্গে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইতালির মতো দেশগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির ক্ষেত্রে এই আইনি পরিবর্তন ছিল অপরিহার্য। অস্ত্র রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকলে যৌথভাবে উৎপাদিত সরঞ্জাম অন্য দেশে বিক্রির ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হচ্ছিল, যা এখন দূর হলো।
তবে এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে জাপানের অভ্যন্তরে এবং আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি জাপানের সংবিধানের ‘অনুচ্ছেদ ৯’ (Article 9)-এর মূল চেতনার পরিপন্থী। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাপান যুদ্ধকে চিরতরে বর্জন করার এবং কোনো ধরনের যুদ্ধংদেহী সক্ষমতা না রাখার অঙ্গীকার করেছিল। নতুন এই নীতি সেই শান্তিবাদী ভাবমূর্তিকে কালিমালিপ্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া এবং চীনের মতো দেশগুলো, যারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি আগ্রাসনের শিকার হয়েছিল, তারা জাপানের এই পুনঃসামরিকীকরণ প্রক্রিয়াকে সন্দেহের চোখে দেখতে পারে। তবে টোকিও আশ্বস্ত করেছে যে, এই রপ্তানি কেবল কঠোর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনেই পরিচালিত হবে।
প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এই সিদ্ধান্তকে ‘অনিবার্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি মন্ত্রিসভার বৈঠকে উল্লেখ করেন যে, জাপানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা কেবল দেশের ভেতর সীমাবদ্ধ রাখলে বর্তমানের জটিল ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে মিত্র দেশগুলোর সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
বর্তমানে জাপানের নিরাপত্তা কৌশল মূলত এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর কেন্দ্রীভূত। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং তাইওয়ান প্রণালীর উত্তজনা জাপানের নীতিনির্ধারকদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। তারা মনে করছেন, শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প কেবল নিরাপত্তার জন্যই নয়, বরং জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্যও একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, জাপানের এই ‘মারণাস্ত্র’ রপ্তানির সিদ্ধান্ত কেবল একটি বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নয়, বরং এটি জাপানের নতুন এক বৈশ্বিক পরিচয় তৈরির চেষ্টা। শান্তিবাদী আদর্শ থেকে সরে এসে একটি ‘স্বাভাবিক’ সামরিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার এই পথ জাপানকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কতটা প্রভাবশালী করে তোলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



